গঙ্গা নদীর হাঙর কীভাবে ইন্দোনেশিয়ায় গেল
নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই হাঙরের পরিচয়। ‘গাঙ্গেয় হাঙর’ নামটি এসেছে গঙ্গা নদী থেকে।
১৮৩৯ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদী থেকে পাওয়া একটি নমুনার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা প্রথম এই হাঙরকে শনাক্ত করেন। হুগলি যেহেতু গঙ্গা নদীরই একটি শাখা, তাই এর নাম দেওয়া হয় ‘গাঙ্গেয় হাঙর’।
গাঙ্গেয় হাঙর এতোটাই দুর্লভ যে জীবিত অবস্থায় এর ছবি তোলার ঘটনা এখনো ঘটেনি।
ঘোলা ও লবণাক্ত পানির মিশ্রণে থাকা নদীতে এর বসবাস হওয়ায় এই হাঙরকে দেখা খুব কঠিন।
পৃথিবীতে নদীতে বসবাসকারী মাত্র তিন প্রজাতির হাঙরের একটি এটি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) লাল তালিকার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রাপ্তবয়স্ক গাঙ্গেয় হাঙর রয়েছে আনুমানিক ২৪০টি।
জীববিজ্ঞানীদের কাছে এই হাঙরের অস্তিত্বের প্রমাণ মূলত মাছ ধরার জালে ধরা পড়া মৃত হাঙর। কখনো আবার শুধু এর একটি পাখনা পাওয়া গেছে।
গবেষকরা জানান, বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় থাকা এই হাঙর বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের কিছু এলাকার নদীতে বেশি পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ ২০১৭ সালে এই প্রজাতির হাঙরকে গঙ্গা বা তার আশপাশের নদীতে পাওয়া গেছে। এরপর প্রায় ৬ বছর বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদীগুলোতে আর গাঙ্গেয় হাঙরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার প্রত্যন্ত বোর্নিও দ্বীপের সেসায়াপ নদীতে এই হাঙরের আবাসস্থল খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। তাদের ধারণা, এটাই এই প্রজাতির সম্ভাব্য সর্বশেষ আবাসস্থল। একইসঙ্গে এই আবাসস্থল খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে এই বিরল প্রজাতির টিকে থাকার নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
আজ বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এই হাঙরের নতুন আবাসের বিস্তারিত তথ্য।
যেভাবে ইন্দোনেশিয়ায় গাঙ্গেয় হাঙরের দেখা মিলল
২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল গ্র্যান্টের নেতৃত্বে একটি দল ইন্দোনেশিয়ার উত্তর কালিমানতান অঞ্চলে অনুসন্ধান চালান।
দেশটির বোর্নিও দ্বীপে সেসায়াপ নদীর তীরে একটি গ্রামে গিয়ে গ্র্যান্ট এক জেলের সঙ্গে কথা বলেন, যিনি এক সপ্তাহে ১৭টি মৃত গাঙ্গেয় হাঙর ধরেছিলেন।
গ্র্যান্টের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের ২০ বছরে সারা বিশ্বে যত গাঙ্গেয় হাঙর শনাক্ত করা হয়েছিল, ওই জেলের ধরা হাঙরের সংখ্যা তার চেয়েও বেশি।
অস্ট্রেলিয়ার চার্লস ডারউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বেনায়া সিমিওন বলেন, ‘এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।’
এই আবিষ্কারের পর ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার হাঙর বিশেষজ্ঞ দল সেসায়াপ নদীকে গুরুত্বপূর্ণ হাঙর ও রে মাছের এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
চলতি বছরের মে মাসে গবেষকেরা আবার ওই এলাকায় যান। এবার তাদের লক্ষ্য ছিল গাঙ্গেয় হাঙরের সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ শুরু করা।
অনুসন্ধানে আরও গাঙ্গেয় হাঙরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুই দফার অনুসন্ধান মিলিয়ে শনাক্ত হওয়া হাঙরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩টিতে। তবে এর বেশিরভাগই ছিল গ্রামগুলোতে শুকাতে দেওয়া হাঙরের পাখনা। সেগুলো কীভাবে মারা গেছে, তা নিশ্চিত নয়।
গ্র্যান্টের ভাষায়, এটি ছিল অসাধারণ সফল একটি অভিযান। স্থানীয় বেশিরভাগ মানুষই এই প্রজাতির রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তারপরও এই অঞ্চলে গাঙ্গেয় হাঙর পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয় বলে মনে করেন গবেষকরা।
তাদের মতে, এই এলাকায় মাছের বায়ুথলি বা ফিশ মাওয়ের বড় বাজারই বড় বিপদের আশঙ্কা।
মাছের বায়ুথলি হলো—মাছের শরীরের ভেতরে থাকা একটি পাতলা থলির মতো অঙ্গ, যা মাছকে পানিতে ভেসে থাকতে সাহায্য করে। এই অঙ্গটি শুকিয়ে ফিশ মাও নামে বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে চীনে এটি দামি খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এর চাহিদা অনেক।
ফিশ মাওয়ের চাহিদা বাড়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শিকারও বাড়ছে। তাই হাঙরসহ অন্যান্য মাছের ধরা পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
যেভাবে রক্ষা হবে
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাঙ্গেয় হাঙর নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রাণীটিকে গবেষণা করাই কঠিন। অথচ বিলুপ্তির ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
গবেষক বেনায়া সিমিওন বলেন, ‘এই প্রজাতি সম্পর্কে এখনো খুব কম তথ্য রয়েছে। একই সময়ে তারা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।’
গবেষকেরা জানান, তারা তাদের অনুসন্ধানের ফলাফল ও সুপারিশ স্থানীয় সরকারকে দেবেন। এরপর বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্ব পেতে পারে এবং নতুন আইন বা বিধিনিষেধও আসতে পারে।
তবে ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন এজেন্সির প্রধান গবেষক ড. ফাহমি বলেন, ‘শুধু গাঙ্গেয় হাঙরকে কেন্দ্র করে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে পুরো এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করলে বেশি কার্যকর হবে।’
বিশ্বের অন্যান্য এলাকায় গাঙ্গেয় হাঙরের সংখ্যা হয়তো বিলুপ্তির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে উত্তর-পূর্ব বোর্নিওতে পাওয়া এই হাঙরের সংখ্যা যদি যথেষ্ট হয়, তাহলে প্রজাতিটিকে বাঁচানোর শেষ সুযোগ এখান থেকেই আসতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা।
গাঙ্গেয় হাঙর নিয়ে এত গবেষণা করলেও গ্র্যান্ট বা তার দলের কেউ এখন পর্যন্ত জীবিত কোনো গাঙ্গেয় হাঙর দেখেননি।