২০২০ সালের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুললেন ট্রাম্প

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে, প্রথম মেয়াদ শেষে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা জো বাইডেনের কাছে হেরে হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন।

ওই নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি আজও বহন করে বেড়াচ্ছেন এই মার্কিন নেতা। স্পষ্ট ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পরও তিনি নানা ষড়যন্ত্র ও কারচুপির কথা বলে আসছেন।

এই ধারায় গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন এক বোমা ফাটিয়েছেন সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী ট্রাম্প।

গতকাল ট্রাম্প কয়েকটি গোপন নথি প্রকাশ করেন।

তার দাবি, এসব নথি ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ বিষয়টি জানা গেছে।

এর আগেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূল্যায়ন দিয়েছে, ওই নির্বাচনে বেইজিং কোনো প্রভাব ফেলেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সেই মূল্যায়নের পরও ট্রাম্প আবারও নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে তার দীর্ঘদিনের অভিযোগ সামনে নিয়ে এসেছেন।

২৫ মিনিটের প্রাইম-টাইম ভাষণে ট্রাম্প আসন্ন নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচনের আগে নির্বাচনী নিরাপত্তাকে একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ট্রাম্প ও তার দলের জনপ্রিয়তা তলানির দিকে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ভাষণে ট্রাম্প ভোটার পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নতুন শর্ত আরোপ করে আইন পাসের জন্য কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের প্রতি আবারও আহ্বান জানান।
তবে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও তদন্তে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভোট জালিয়াতির ঘটনা খুবই বিরল।

ডেমোক্র্যাটদের তীব্র বিরোধিতার কারণে প্রস্তাবিত আইনটি সিনেটের অনুমোদন পায়নি।

ট্রাম্পের দাবি: নির্বাচনী ব্যবস্থায় ‘বিস্ময়কর দুর্বলতা’ আছে

ট্রাম্প দাবি করেন, প্রকাশ করা নথিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর ‘বিস্ময়কর দুর্বলতা’ তুলে ধরবে।

তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণে বেশ কয়েকটি নথি ট্রাম্পের দাবির বিপরীত তথ্য তুলে ধরেছে। অন্যান্য নথিতে উল্লেখিত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার এক কঠিন রাজনৈতিক সময়ে এই ভাষণ দেন ট্রাম্প।

এই পরিস্থিতির মাঝে দেওয়া ভাষণের শুরুতে তিনি সংক্ষেপে যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বড় ধরনের জয়’ পাচ্ছে। এরপর কর কমানো ও অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতিসহ সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের কথা তুলে ধরে নির্বাচনী নিরাপত্তার প্রসঙ্গে যান।

ট্রাম্প বলেন, তিনি এমন সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করছেন, যাতে দেখা যায় চীন বেআইনিভাবে ২২ কোটি মার্কিন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করেছে।

চীনের হাতে মার্কিন ভোটারদের নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।

তার অভিযোগ, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা চীনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি সম্পর্কে তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছেন।

তবে ২০২১ সালে প্রকাশিত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো বিদেশি পক্ষের বিরুদ্ধে ভোটার নিবন্ধন, ব্যালট, ভোট গণনা বা ফলাফলের মতো কোনো প্রযুক্তিগত দিক পরিবর্তনের চেষ্টা বা সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই মূল্যায়ন করা হয়েছিল জন র‌্যাটক্লিফের নেতৃত্বে। সে সময় তিনি ছিলেন ট্রাম্পের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক। বর্তমানে তিনি সিআইএর পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

র‌্যাটক্লিফের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা ওই গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, অন্তত ২০০৮ সাল থেকে চীন মার্কিন ভোটার, জনমত, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে আসছে।

ধারণা করা হয়, নির্বাচনের ফল অনুমান করার উদ্দেশ্যেই এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চীনের হাতে যাওয়া ভোটারদের তথ্য গোপনীয় ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরামর্শকেরা নিয়মিত এ ধরনের ভোটার তালিকা কিনে থাকেন এবং এসব তথ্য ব্যবহার করে ভোটের ফল পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

চীন-সংক্রান্ত এসব তথ্য প্রকাশ করলে তা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে—এমন মত দেন হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা।

ট্রাম্পের ভাষণের আগে কর্মকর্তাদের এই উদ্বেগের বিষয়টি সূত্রগুলোর কাছ থেকে জানতে পেরেছে রয়টার্স।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন নিয়ে ট্রাম্পের এই কঠোর বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

ট্রাম্পের ভাষণ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ভাষণের আগে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং বলেন, ‘চীন কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।’

পুরোনো দাবিই আবারও সামনে

ট্রাম্প বহু বছর ধরেই মার্কিন নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। তিনি বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে তার পরাজয় ছিল কারচুপির ফল। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ দিতে পারেননি।

ডাকযোগে ভোটে ব্যাপক জালিয়াতি হয়, ভোটিং মেশিন বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং মার্কিন নাগরিক নন এমন অসংখ্য মানুষের ভোটে ফলাফল বদলে যায়—এমন দাবিও তিনি করে আসছেন।

তবে বিভিন্ন আদালতের রায় এবং পুনর্গণনায় ২০২০ সালের নির্বাচনে বড় ধরনের জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তার পরও ট্রাম্পের এই প্রচার তার সমর্থকদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে।

এপ্রিল মাসে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান বিশ্বাস করেন যে ২০২০ সালের নির্বাচনে চুরি করে ট্রাম্পকে হারানো হয়।

কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন মাত্র চারটি অঙ্গরাজ্যে ২ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি অ-নাগরিকের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত থাকার প্রমাণ পেয়েছে।

তবে তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতজন ভোট দিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।

অতীতে কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত ব্যবস্থা ভুল করে বৈধভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া কিছু মার্কিন নাগরিককে অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অ-নাগরিকদের প্রকৃত ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, সদ্য প্রকাশিত নথিগুলো নির্বাচনী নিরাপত্তার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ করবে। কিন্তু অনেক নথিই তার দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় অথবা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

US Senator Warner aims for meeting of Democrats to discuss Biden candidacy,  source familiar says | Reuters
ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। ছবি: রয়টার্স

ভাষণ চলাকালে সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘চীন নিয়ে ট্রাম্পের তথাকথিত বিস্ফোরক তথ্য পুরোপুরি ভিত্তিহীন। বাস্তবতা হলো, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, ২০২০ সালের নির্বাচনে একটি ভোটও পরিবর্তনের চেষ্টা চীন করেনি।’

রাজনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরলেও, ২০২০ সালের কোনো ভোট বাস্তবে পরিবর্তন বা কারসাজি করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি।

ট্রাম্প আবারও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাসের আহ্বান জানান। এই বিলে ভোট দিতে ছবি-সংবলিত পরিচয়পত্র এবং ভোটার নিবন্ধনের জন্য মার্কিন নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে।

ডেমোক্র্যাট ও ভোটাধিকারকর্মীদের দাবি, এই আইন বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার সীমিত করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।

বিলটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে একাধিকবার পাস হলেও, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের রাজি করিয়ে প্রয়োজনীয় ৬০ ভোট জোগাড় করতে সক্ষম হননি ট্রাম্প।

রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন নেতা ট্রাম্পকে ২০২০ সালের নির্বাচন নয়, বরং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়সহ সাধারণ মার্কিনিদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

৪৩৫ সদস্যের মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের মাত্র তিনটি রিপাবলিকান আসন নিজেদের দখলে আনতে হবে।

তবে রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় ১০০ সদস্যের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।