নেপালের জেন-জি সরকারের ১০০ দিনে কেমন করলেন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ?
নেপালের প্রথাগত সরকারব্যবস্থাকে কার্যত উপড়ে ফেলে ক্ষমতায় আসেন র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত হওয়া জেন-জি নেতা বালেন্দ্র শাহ।
ভক্ত-সমর্থকদের কাছে ‘বালেন’ নামে পরিচিত এই নেতার শাসনামলের ১০০ দিন ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে।
এই পুরো সময়টা জনসম্মুখে খুব বেশি না আসলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘আমূল সংস্কারের’ কার্যক্রম নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেছেন তিনি।
আজ রোববার তিনি ১০০ দিনের মাইলফলক অর্জন করেন। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত, আইনি বিতর্ক
শপথ নেওয়ার একদিন পরই পুলিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও তার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে ওলির সরকারের পতন হয়।
আন্দোলনে সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। ওই কমিটির সুপারিশে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না করেই তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত চলছে।
পর্যবেক্ষকরা মত দেন, প্রথম উদ্যোগেই বালেন্দ্র শাহর সরকারের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে আভাস মেলে।
সরকার দ্রুত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন একের পর এক পদক্ষেপ নেয়।
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেও এর বেশিরভাগই আইনি বাধার মুখে পড়ে।
কিছু উদ্যোগের বাস্তবায়ন হলেও সেসব ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে তাড়াহুড়া করার প্রবণতা দেখা যায়।
পর্দার আড়ালে বালেন
বালেন শাহ গত ১০০ দিনে নিজেকে পর্দার আড়ালে রাখতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেছেন।
বেশিরভাগ সময় যোগাযোগের জন্য সমাজ মাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছেন এই নেতা। পাশাপাশি, র্যাপ গানের মাধ্যমেও বক্তব্য দিয়েছেন এই ব্যতিক্রমধর্মী তরুণ নেতা।
তিনি বিদেশি দূত ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে সশরীরে দেখা করার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন বারবার।
নেপালের যেকোনো সরকার প্রধান ক্ষমতা গ্রহণের পর সবচেয়ে প্রথম ভারত ও চীন সফরে যান। কিন্তু ওই দুই মহাগুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশেও যাননি বালেন। প্রতিনিধি হিসেবে নিজের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক প্রণয় রানা বলেন, ‘তিন মাস পেরিয়ে গেলেও যাকে আমরা ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছি, তার ব্যাপারে খুবই কমই জানা আছে আমাদের। তাকে আরও জনসম্পৃক্ত হতে হবে।’
পরিবর্তনের ‘মহাসড়ক’
বিক্ষোভ-আন্দোলনের পর আয়োজিত ৫ মার্চের নির্বাচনে বাকি সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে উড়িয়ে দেন বালেন শাহ।
ক্ষমতাগ্রহণের পর তার সরকার একটি ১০০ দফা সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেয়। এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, উন্নত সরকারি সেবা ও ডিজিটালাইজেশনের মতো উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সরকারের ভাষ্য, প্রথম ১০০ দিনে তারা ৭০টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। বাকিগুলোও বাস্তবায়নের পথেই আছে।
জুনে ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্তর পার্টির এক সভায় জনসম্মুখে ‘বিরল’ বক্তব্য রাখেন বালেন শাহ।
তিনি দাবি করেন, তার প্রশাসন পরিবর্তনের মহাসড়ক ধরে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
‘গন্তব্যে পৌঁছালেই কেবল আমরা ব্রেক চাপবো’, যোগ করেন তিনি।
পাশাপাশি, সরকার ১৩ দশমিক আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীল করতে এই অর্থ খরচ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী স্বর্ণীম ওয়াগলে বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘জাতি এখন অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে।’
সতর্ক থাকার আহ্বান
১০০ দিনের এই ঝটিকা কার্যক্রমে অনেক মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন বালেন শাহ।
সাংবাদিক সুধীর শর্মা বলেন, ‘প্রথমত, তিনি কাজ করার ধরন পালটেছেন—প্রথম দিন থেকেই সরকার কাজ করতে শুরু করেছে, যা নজিরবিহীন।
তিনি মত দেন, ‘সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এই সরকার কথা নয়, কাজেই বিশ্বাসী।’
তবে বালেনের সমালোচকেরও অভাব নেই। বিশেষত, বিরোধী পক্ষগুলো তার সরকারের কড়া সমালোচনায় মেতেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির কমিউনিস্ট পার্টি সিপিএন-ইউএমএল গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, সরকারের কার্যক্রম ‘খুবই দুর্বল, অপরিপক্ব ও বিতর্কিত।’
দেশের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে নতুন আইন পাসের নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেও অধ্যাদেশ জারি করে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে বালেনের সরকার।
কোনো কোনো বিশ্লেষক এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়ায় কাজের গতি বেশি থাকলেও এতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এর ধাপটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক গবেষক আনুশা খানাল মত দেন, ‘অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে হয়েছে, সেটা নিয়ে একেকজনের মনে একেক রকম ধারণা।’
‘আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক কাউন্সিলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।
ওই কাউন্সিলের সভাপতি বালেন্দ্র শাহ নিজেই। কাউন্সিলটি বিচারক নিয়োগসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সংবিধান পরিবর্তন ও নেপালের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের আলোচনায় উত্তপ্ত হয়েছে নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গন।
২০২৫ সালের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ইউজান রাজভান্ডারি (২৩) এএফপিকে বলেন, এই সরকার ‘বিক্ষোভ-আন্দোলনের গর্ভে জন্ম নিয়েছে।’
‘তাদেরকে বিক্ষোভে জড়িতদের কণ্ঠস্বরকে আমলে নিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকারের প্রতি আমাদের অনেক আশা-ভরসা। তারা ফলাফল অর্জনকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এটা খুশীর বিষয়। কিন্তু সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই ফলাফল না এলে তা টেকসই হবে না।’
বস্তি উচ্ছেদের উদ্যোগেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন বালেন শাহ।
সাংবাদিক প্রণয় রানা এএফপিকে বলেন, ‘প্রথম ১০০ দিন সবাই সরকারকে ভালো চোখে দেখে। এরপর থেকেই বিতর্ক শুরু হতে থাকে। এমন কী, জনগণও সমালোচনা করতে শুরু করে।’



