বিশ্লেষণ

২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্প–মামদানির ভিন্ন দর্শন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন ঘিরে দেশজুড়ে ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক মাইলফলক রাজনৈতিকভাবে একেবারেই ভিন্ন দুই বার্তা সামনে নিয়ে এসেছে।

গত শুক্রবার সাউথ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কমিউনিজমের হুমকি’ থেকে রক্ষার আহ্বান জানান। শনিবার ওয়াশিংটনে দেওয়া বক্তব্যেও দেখা যায় একই সুর। 

অপর দিকে, গত শুক্রবার নিউইয়র্ক সিটি হলে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন এমন মানুষদের উপস্থিতিতে দেওয়া ভাষণে মেয়র জোহরান মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসকে ‘অভিবাসীদের অবদানের ইতিহাস’ আখ্যা দেন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের পক্ষে অবস্থান নেন। 

সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান ও এপি বলছে, একই জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া দুই নেতার ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে। 

ট্রাম্পের বার্তা: দেশপ্রেম বনাম ‘কমিউনিস্ট হুমকি’

স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর উদযাপনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ উপলক্ষে মাউন্ট রাশমোরে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের আদর্শ রক্ষা করতে হবে।’ 

তিনি অভিযোগ করেন, দেশে নতুন করে ‘কমিউনিস্ট হুমকি’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা সেই আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছে।

ভাষণে অভিবাসন প্রসঙ্গও তোলেন ট্রাম্প। 

‘আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রে এসে কমিউনিজমের প্রচারণা চালান, তাহলে আপনাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত করা উচিত’, বলেন ট্রাম্প।

এই বক্তব্যে তিনি অভিবাসন প্রসঙ্গকে কমিউনিজমবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেন।

গতকাল শনিবার ওয়াশিংটনে বৃষ্টির কারণে বিলম্বিত ভাষণে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ ও ভিয়েতনামের যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের বিশেষ প্রশংসা করেন। 

তবে তিনি কোরিয়া ও ভিয়েতনামের যুদ্ধকে ‘কমিউনিস্টদের’ বিরুদ্ধে লড়াই আখ্যা দেন। শুক্রবারের বক্তব্যেও তিনি একই ধরনের বয়ান দিয়েছিলেন। 

‘আমাদের যোদ্ধারা বিশ্বজুড়ে, বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়েছেন, এটা দেখতে নয়, যে পেছনের দরজা দিয়ে সেই অশুভ শক্তি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আমরা সেটা হতে দেব না’, যোগ করেন তিনি। 

২০১৫ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর থেকেই কমিউনিজম (সমাজতন্ত্র) ও অভিবাসনবিরোধী অবস্থান ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয়। 

নির্বাচনী প্রচার এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, গণহারে বহিষ্কারসহ নানা পদক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

বক্তব্য রাখছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
বক্তব্য রাখছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

বিশ্লেষকদের মতে, মাউন্ট রাশমোরের ভাষণে ট্রাম্প সরাসরি সব অভিবাসীর সমালোচনা করেননি। তবে তিনি অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বিষয়টিকে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

ট্রাম্পের ভাষণে দেশপ্রেম, জাতীয় ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের উত্তরাধিকার রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণই ছিল প্রধান সুর।

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের আগে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে রিপাবলিকান প্রার্থী ও পরবর্তীতে মেয়র পদে বিজয়ী জোহরান মামদানিকেও ‘কমিউনিস্ট’ বলে গালাগাল করতে ছাড়েননি ট্রাম্প। 

মামদানির বার্তা: যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের দেশ

মাউন্ট রাশমোরে ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে নিউইয়র্ক সিটি হলে সদ্য নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন মেয়র জোহরান মামদানি।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের অবদানের মাধ্যমে। আইরিশ, চীনা, ইহুদি, ইতালীয়, সিরীয়সহ বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন নাগরিকরাই যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন।

মামদানি বলেন, দেশপ্রেম মানে দেশের দুর্বলতাগুলো অস্বীকার করা নয়, বরং সেগুলো স্বীকার করে দেশকে আরও ভালো করার চেষ্টা করা। 

তিনি আরও বলেন, এমন একটি ধারণা প্রচার করা হচ্ছে যে, আমেরিকা কেবল নির্দিষ্ট উচ্চারণ, বর্ণ বা পরিচয়ের মানুষের জন্য। এই ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

দুটি ভিন্ন আমেরিকার চিত্র

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া এই দুটি ভাষণ বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিচ্ছবি।

ট্রাম্পের বক্তব্যে জাতীয় পরিচয়কে নিরাপত্তা, আদর্শিক আনুগত্য ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিপরীতে মামদানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে অভিবাসন, বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস তাই কেবল ঐতিহাসিক উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ পরিচয়, অভিবাসন এবং দেশপ্রেমের সংজ্ঞা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।