বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা জারি-সেনা মোতায়েন, কী চলছে সেখানে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আন্দিজ অঞ্চলের দেশ বলিভিয়ায় গতকাল শনিবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। সেখানে বিভিন্ন সড়কে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী। বার্তাসংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে।

রক্ষণশীল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গত ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শ্রমিক ইউনিয়ন, আদিবাসী গোষ্ঠী এবং কোকা চাষিরা দেশজুড়ে বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে। তারা বিভিন্ন শহরে মিছিল করার পাশাপাশি ইট-পাথর, আবর্জনা ও কাঠের গুঁড়ি ফেলে প্রধান প্রধান সড়কগুলো অবরোধ করে রেখেছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই অবরোধের ফলে বলিভিয়ার বড় শহরগুলোতে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতি কয়েক বিলিয়ন ডলার পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই গণবিক্ষোভ গত দুই দশকের মধ্যে দেশটির প্রথম সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের বাইরের সরকারের পতন ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শনিবার ভোররাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে বলেন যে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলমান সংকট নিরসনে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।

প্রেসিডেন্ট ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের অধিকার খর্ব হলো এবং দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পথ প্রশস্ত হলো।

বলিভিয়ায় সেনা মোতায়েন
প্রেসিডেন্টের ভাষণের পর সেনা মোতায়েন। ছবি: এএফপি

প্রেসিডেন্টের ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মাথায় এল আল্টো শহরে সড়ক অবরোধ সরাতে বুলডোজার নামানো হয়। এ সময় সেনা সদস্য ও সশস্ত্র পুলিশকে বিশাল গাড়িবহর নিয়ে সেখানে অবস্থান নিতে দেখেন এএফপির সাংবাদিকরা।

এ সময় স্থানীয়দের অনেককেই উৎসাহ নিয়ে হাততালি দিতে দেখা যায়। এমনকি এক ব্যক্তিকে পিকআপ ভ্যানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তার হাতে এক ব্যাগ রুটি তুলে দিতেও দেখা যায়।

৩৯ বছর বয়সী দোকানি কার্লা বুত্রন এএফপিকে বলেন, আমি খুব খুশি। ৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে এল আল্টোবাসীর জন্য সবকিছুই খুব কঠিন ছিল—সেটা কাজ হোক কিংবা অবাধ চলাচল।

প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি

লা পাজ শহরের চিত্র এখন থমথমে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে নৌবাহিনী ও মিলিটারি পুলিশ। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশের বিশেষ চৌকস দল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পাজ লেখেন, অবরোধের নামে সাধারণ মানুষকে এভাবে আর জিম্মি করে রাখা যায় না। এই অচলাবস্থার কারণে মানুষ কাজে যেতে পারছে না, শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না, এমনকি চিকিৎসাসেবা আর দুবেলা খাবারের জোগান দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জরুরি অবস্থা জারির উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নেওয়া নয়, বরং সেই স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা।

বিক্ষোভকারীদের দাবি একটাই—প্রেসিডেন্ট পাজকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। নির্বাচিত হওয়ার এক বছর পার হওয়ার আগেই তার নেওয়া ‘উদার অর্থনৈতিক সংস্কার’ নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ।

সড়কে নামানো হয়েছে বুলডোজার
সড়কে নামানো হয়েছে বুলডোজার। ছবি: এএফপি

সংকট কাটাতে ৫৮ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট অবশ্য নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই দেশের অন্যতম প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সমঝোতা করেন তিনি।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। বিনিময়ে আন্দোলন প্রত্যাহারে রাজি হয় ‘বলিভিয়ান ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল’ ইউনিয়ন।

তবে এই সমঝোতায় বরফ গলেনি। বেশ কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল। দেশের অন্তত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে এখনো অবরোধ বহাল রয়েছে।

আদিবাসী আইমারা নেত্রী লিডিয়া ক্যালিসায়ার কণ্ঠে ঝরছিল চরম অসন্তোষ। তিনি বলেন, আমরা তার শাসন আর চাই না, তার বিদায়ই এখন আমাদের একমাত্র দাবি।

সাবেক প্রেসিডেন্টকে দুষছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট

এক পক্ষ যখন আন্দোলনে, সাধারণ বলিভিয়ানদের একটি বড় অংশ তখন অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মুখিয়ে আছে।

লা পাজগামী সড়কের পাশে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকা ৪৯ বছর বয়সী ট্রাকচালক এরল্যান্ড রিচার্ড সেগোভিয়া পূর্ব দিকের শহর সান্তা ক্রুজে যাওয়ার আশায় ছিলেন।

দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেন, রাস্তায় আমাদের একরকম অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল, অপেক্ষা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। তবে এখন অন্তত মনে হচ্ছে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

প্রেসিডেন্ট পাজ এই সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের পেছনে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ এবং বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের হাত রয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন।

সেনা টহল
সড়কে টহল দিচ্ছেন সেনা সদস্যরা। ছবি: এএফপি

কট্টর বামপন্থী ও অগ্নিকণ্ঠ জননেতা হিসেবে পরিচিত ইভো মোরালেস ছিলেন বলিভিয়ার প্রথম আদিবাসী প্রেসিডেন্ট। সাবেক এই কোকা চাষী ২০০৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন।

বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এক নাবালিকাকে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা তিনি শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন।

মধ্য বলিভিয়ার চাপারে অঞ্চলটি এখন মোরালেসের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার আদিবাসী সমর্থক তাকে ঘিরে রেখেছেন, যেন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারে।

এদিকে, শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো আন্তোনিও ওভিয়েডো সাবেক এই নেতাকে ধরার জন্য কোনো অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দেননি।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। মোরালেসকে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

অন্যদিকে, আত্মগোপনে থাকা অবস্থাতেই এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোরালেস বলেন, বলিভিয়ার সাধারণ মানুষ এখন এই রক্ষণশীল সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, কারণ এই সরকার আমেরিকার কাছে ‘পুরোপুরি আজ্ঞাবহ’ বা নতিস্বীকারকারী।