গাজায় ইসরায়েলের হামলায় আল জাজিরার ক্যামেরাম্যান নিহত
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা আল জাজিরার ক্যামেরাম্যান নিহত হয়েছেন। বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধি আহমেদ উইশাহ গতকাল শনিবার মধ্য গাজায় নিজ বাড়িতেই ছিলেন। তখন তার ওপর হামলা হয়। প্রতিষ্ঠানটি এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।
তবে ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, উইশাহ হামাসের সামরিক শাখার সদস্য ছিলেন এবং স্নাইপার হিসেবে কাজ করতেন।
গাজার হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এক হাজার সাত জন নিহত হয়েছেন।
শনিবার উইশাহর মৃত্যু নিয়ে আল জাজিরা বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের এক চরম লঙ্ঘন এবং সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার একটি ধারাবাহিক অপচেষ্টা।
তবে ইসরায়েলি বাহিনী কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছে যে, উইশাহ ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।
বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি হামলায় উইশাহর সঙ্গে আরও দুইজন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল তাদেরও হামাস সদস্য বলে দাবি করেছে।
গত এপ্রিলে উইশাহর ভাই মোহাম্মদও ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান, যিনি আল জাজিরাতেই কাজ করতেন। তখন তার বিরুদ্ধেও রকেট তৈরির কারখানায় যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছিল আইডিএফ।
অন্যদিকে, গাজা শহরের সাবরা পাড়ায় রাতভর হামলায় একই পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। শিফা হাসপাতাল নিশ্চিত করেছে যে, নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারী রয়েছে।
নিহতদের স্বজন নায়েল সাফাদি জানান, তার পরিবার সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল এবং হামাসের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
নিহতদের আরেক আত্মীয় মোহাম্মদ সাফাদি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, এটা কি আসলেই কোনো যুদ্ধবিরতি? আমরা সাধারণ বেসামরিক মানুষ। আমি কখনো হাতে অস্ত্র তুলে নিইনি।
গাজার দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলেও নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। গত অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস—উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে।
চুক্তি অনুযায়ী গাজায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, চাহিদার তুলনায় ত্রাণ অত্যন্ত অপ্রতুল।
জাতিসংঘের মতে, গাজার প্রায় ৮১ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রধান টম ফ্লেচার নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন, ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমানোর হার ৯২ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজার ৭০ শতাংশ মানুষের এখনো সঠিক বাসস্থানের প্রয়োজন। সেখানে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম অবনতি হয়েছে এবং জরুরি পরিষেবাগুলো ভেঙে পড়ার মুখে।
তিনি আরও বলেন, আজ গাজার ফিলিস্তিনিরা সেই মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত যা আপনারা আপনাদের নিজেদের পরিবারের জন্য চান— নিরাপত্তা, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা।
চুক্তির শর্ত ছিল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং গাজার শাসনে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না, যা এখনো কার্যকর হয়নি।
এদিকে, গাজা পরিচালনার জন্য একটি অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির কাজ তদারকি করতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের নিয়ে একটি বোর্ড অফ পিস বা শান্তি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ আছে, ইসরায়েল গাজা দখল করবে না এবং যুদ্ধের সময় দখল করা অঞ্চলগুলো পর্যায়ক্রমে হস্তান্তর করবে। তবে গত মে মাসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা আইডিএফের নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধারা দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালালে প্রায় এক হাজার ২০০ জন নিহত হন। তখন ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। এরপর থেকেই হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ শুরু হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।