এক্সপ্লেইনার

গাজা নিয়ে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কী আছে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস। ওই হামলায় প্রায় এক হাজার ২০০ মানুষ নিহত ও ২৫০ জন জিম্মি হন। সেদিনই গাজার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। 

প্রায় দুই বছর ধরে চলা বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের পর অনেকের ধারণা ছিল, গাজায় ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে।

২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা স্বাক্ষরের পর ধারণা করা হয়েছিল, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমে আসবে। 

ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন (হলুদ রেখা)’–এর পেছনে সরে যাওয়ার কথা ছিল। চুক্তি মতে, তারা গাজার ৫৮ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে এবং পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি সরে যাওয়ার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।  

কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

বরং এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মাঝেও গাজায় প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনা। পাশাপাশি, আরও বেশি ভূখণ্ডের দখল নিয়েছে ইসরায়েল।  

স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, তারা এমন সব এলাকায় নতুন সামরিক চৌকি, স্থল প্রতিবন্ধকতা ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে যেগুলো মূলত অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ রেখা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল।

ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আসলে কী?

ইসরায়েল কি গাজার আরও ভূখণ্ড দখল করতে চায়?

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি নেতাদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।

বৃহস্পতিবার এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ অঞ্চল এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। এর আগে ৫০ শতাংশ আমাদের হাতে ছিল। সেখান থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছে গেছি।’

‘এখন আমার নির্দেশনা হলো, আরও এগিয়ে যাও—ধাপে ধাপে আগাতে থাকো—প্রথমত, ৭০ শতাংশ দখলে নিতে হবে। এই লক্ষ্য হাতে নিয়ে আমরা কাজ শুরু করব’, যোগ করেন তিনি। 

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—গাজায় ইসরায়েলের উপস্থিতি কি সাময়িক, নাকি এটি স্থায়ী ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার অংশ?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো রাষ্ট্র স্থায়ীভাবে অন্য একটি ভূখণ্ডের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সংযুক্তিকরণ বা অ্যানেক্সেশন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এটি কি আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ?

এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর—না।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) অতীতের বিভিন্ন মতামতে বলেছে, শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ড দখল আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা শুধু ভূখণ্ড দখলের প্রশ্নই নয়, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে।

গাজার মানুষের জন্য এর অর্থ কী?

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে গাজার জনসংখ্যাকে ক্রমশ ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ করে ফেললে সেখানে জীবনধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট ইতোমধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও বহুবার উঠেছে।

এ অবস্থায় গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

'স্বেচ্ছায় অভিবাসন' বলতে কী বোঝাচ্ছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলের কয়েকজন মন্ত্রী সম্প্রতি গাজাবাসীর ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার বাসিন্দাদের অন্য দেশে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হতে পারে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, যুদ্ধ, অবরোধ ও বসবাসের অযোগ্য পরিবেশের মধ্যে মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হলে তাকে প্রকৃত অর্থে ‘স্বেচ্ছায়’ অভিবাসন বলা যায় না। অনেক পর্যবেক্ষক এটিকে জাতিগত নির্মূলকরণ-এর উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

এরপর কী হতে পারে?

ইরান যুদ্ধ, লেবাননে ইসরায়েলের নির্দয় হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা ও এ থেকে সৃষ্ট সংকটের কারণে সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন বেশ উত্তপ্ত। এ অবস্থায় আলাদা করে গাজাবাসীর দুর্ভোগ-দুর্দশার বিষয়টির ওপর থেকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ অনেকটাই সরে গেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ উল্লেখযোগ্য আকারে না বাড়লে গাজায় ইসরায়েলের বর্তমান নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 

ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার রাজনৈতিক ও মানবিক ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।