চুক্তি নিয়ে আশাবাদী, ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করলেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ইরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিনের অধরা একটি চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী হয়ে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এমনটি জানানো হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, মূলত উপসাগরীয় আরব মিত্রদের অনুরোধেই তিনি এই হামলা স্থগিত করেছেন।
অবশ্য ইরান আগেই হুমকি দিয়ে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি প্রায় ছয় সপ্তাহের চলমান যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে, তবে তাদের আরব মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্প এরইমধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়িয়েছেন এবং রাজনৈতিকভাবে বোঝা হয়ে দাঁড়ানো এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ইরান তার প্রস্তাবিত চুক্তির রূপরেখা প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি মঙ্গলবার নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
সোমবার প্রেসিডেন্ট তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে জানান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা তাকে ইরানের ওপর মঙ্গলবার নির্ধারিত সামরিক হামলা স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছেন, কারণ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ‘যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর পূর্ণ মাত্রায় ও বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরে হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, এ ক্ষেত্রে একটি ‘অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আরব দেশগুলো একটি চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখবে।
ইরান শুরু থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা অস্বীকার করে আসছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হচ্ছে কোনো একটি সমাধানের বিষয়ে ভালো সম্ভাবনা আছে। যদি তাদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় বোমাবর্ষণ ছাড়াই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, তবে আমি খুব খুশি হব।’
ইরান বারবার ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তেহরান নিজেদের ‘উদ্বেগের’ কথা স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন।
কয়েক সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি হামলার পর এখন যুদ্ধবিরতি চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তারা বিদেশে জব্দ করা সম্পদ ছাড়, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা
গত সপ্তাহের এক প্রস্তাবে ইরান লেবানন যুদ্ধসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ এবং ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানায়। পাশাপাশি, যুদ্ধের শুরু থেকে প্রায় বন্ধ থাকা কৌশলগত হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও জোর দেয় তেহরান।
সোমবার ইরান এই প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করে। একইসঙ্গে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানায়, এই প্রণালি দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট ফাইবার অপটিক ক্যাবলগুলোও এখন থেকে ইরানি অনুমতিপত্রের আওতায় আনা হতে পারে।
কুর্দিস্তানে হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
সামরিক চাপ বাড়িয়ে সোমবার ইরান তাদের কুর্দিস্তান প্রদেশে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীদের ওপর হামলা চালায়। বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর দাবি, গোষ্ঠীগুলো ইরাক সীমান্ত দিয়ে মার্কিন অস্ত্র পাচারের চেষ্টা করছিল।
এরইমধ্যে গত রোববার আবুধাবির একটি পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছে ড্রোন হামলার ঘটনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে, যার পেছনে ইরানকে দায়ী করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও যুদ্ধবিরোধী সমালোচক ত্রিতা পারসি বলেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বার্তার উদ্দেশ্য হলো পুরো পরিস্থিতির বয়ান এমনভাবে পাল্টে দেওয়া, যেন মনে হয় সব তার নিয়ন্ত্রণেই আছে।
তিনি আরও মনে করেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সতর্কবার্তার বিষয়টি সত্যি হতে পারে, তবে এটি মূলত ট্রাম্পকে তার আগের হুমকিগুলো থেকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটার একটি সুযোগ করে দিয়েছে।