বাড়ছে চীনা যুদ্ধবিমানের চাহিদা, ভারতের রাফাল ভূপাতিতের সাফল্যই কারণ?
দীর্ঘদিন ধরে অনেক দেশ চীনা যুদ্ধবিমানকে পশ্চিমা বা রুশ বিমানের সস্তা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু সেই ধারণা বদলে যায় যখন গত বছর পাকিস্তান চীনা প্রযুক্তির জে-১০সি বিমান ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যতম সেরা মাল্টিরোল ফাইটার জেট রাফালসহ ভারতের বেশ কয়েকটি উন্নত যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করে।
শুধু তাই নয় রাফাল বিমানকে ভূপাতিত করতে চীনের পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল পাকিস্তান। যার পাল্লা বা রেঞ্জ এত দূর পর্যন্ত হতে পারে—এমন ধারণা ছিল না ভারতের।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনা প্রযুক্তির এই সাফল্যের গল্প বদলে দিয়েছে প্রচলিত ধারণা। যা এখন আধুনিক সমরাস্ত্র বিক্রির কৌশলে একটি বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে বাস্তব যুদ্ধের পারফরম্যান্স অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়।
গত বছর মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত মূলত চীনের জে-১০সি বিমানকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিতের মর্যাদা দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা অস্ত্রের সুনাম পেয়েছে নতুন মাত্রা।
আর সেই ধারাবাহিকতায় আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে চীনা যুদ্ধবিমানের চাহিদা।
শুক্রবার এশিয়া-প্যাসেফিকভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ডিপলোম্যাটের প্রতিবেদনে উঠে আসে চীনা যুদ্ধবিমানের বাড়ন্ত বিক্রির নানা তথ্য।
জে-১০ সিরিজের প্রস্তুতকারক সংস্থা চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের আয় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের বিক্রি গত বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
যদিও সব নতুন অর্ডারই পাকিস্তানের সাফল্যের কারণে এসেছে কি না তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, তবে সময়ের এই কাকতালীয় মিল চাইলেও উপেক্ষা করা যায় না।
অবশ্য জে-১০সি যুদ্ধবিমানের প্রকৃত কার্যকারিতা এখনো প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ওই সংঘাতে বিমান হারানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও এ নিয়ে বিস্তারিত জানায়নি ভারত। অন্যদিকে পাকিস্তানের বড় ধরনের দাবিগুলোও বিভিন্নভাবে বিতর্কিত।
তবুও, অস্ত্রবাজারে প্রমাণের চেয়ে ধারণা ও ভাবমূর্তিই অনেক সময় বড় প্রভাব ফেলে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) ২০২৫ সালের অস্ত্র কেনা-বেচার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সময়কালে প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় পাকিস্তান পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। এ সময় দেশটির সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বেড়েছে আগের তুলনায় ৬৬ শতাংশ।
আর পাকিস্তানের আমদানি করা অস্ত্রের ৮০ শতাংশই সরবরাহ করেছে চীন। শুধু ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং চীনের অস্ত্র বাণিজ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনেও রয়েছে পাকিস্তান।
২০২৫ সালের জুনে রয়টার্স জানায়, ব্যয়, সামঞ্জস্যতা এবং বিক্রয়োত্তর সহায়তার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে চীনের জে-১০ সিরিজের যুদ্ধবিমান কেনার কথা মূল্যায়ন করছে ইন্দোনেশিয়া। পরে অক্টোবরে এপি জানায়, ইন্দোনেশিয়া অন্তত ৪২টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করেছে, যার বাজেট ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা।
রাফালকে অবশ্য খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে পছন্দনীয় বহুমুখী যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। ২০২৫ সালে ভারত ফ্রান্সের সঙ্গে ২৬টি রাফাল-মেরিন বিমান কেনার চুক্তি সই করে। এগুলো ভারতীয় বিমানবাহিনীর কাছে থাকা ৩৬টি রাফালের সঙ্গে যুক্ত হবে।
তবে অস্ত্র বাণিজ্যে সুনাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর রাফালের ক্ষতিই চীনের লাভে পরিণত হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ফরাসি গোয়েন্দারা মনে করেন ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের পর চীন রাফালের বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের উপরও এমন অভিযোগের কথা জানিয়েছে রয়টার্স। স্বভাবতই চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে এই বিতর্ক ইঙ্গিত দেয়, আধুনিক আকাশযুদ্ধ এখন তথ্য যুদ্ধ বা ইনফরমেশন ওয়ারে রূপ নিচ্ছে।
সব জায়গায় জে-১০সি পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের জায়গা নিতে পারবে না। কেননা ক্রেতাদের এখনো উদ্বিগ্ন থাকতে হবে বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণ, সমন্বয় ও রাজনৈতিক নির্ভরতার ওপর।
কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসের পর চীন আরও জোর গলায় বলতে পারবে, তাদের যুদ্ধবিমান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বিমানের তুলনায় সস্তাই নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রেও পরীক্ষিত।
এ কারণেই সিএসির বিক্রি বৃদ্ধি শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতির হিসাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০সির দেখানো সাফল্য, চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাকে বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে আরও বিস্তৃত করে তুলেছে।