ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের যত বিভ্রান্তিকর বক্তব্য

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এখনো যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। 

যুদ্ধের সময়কাল, উদ্দেশ্য ও এর শেষ কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে ট্রাম্প ও তার প্রশাসন বারবার অবস্থান পরিবর্তন করছে এবং একাধিকবার পরস্পরবিরোধী বা বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের নেতৃত্ব কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সেই পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে—এ বিষয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে রাশিয়ার ভূমিকা, ইরানে স্কুলে হামলায় শিশুদের মৃত্যুর দায় কার—এসব নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।

সংবাদ মাধ্যম এবিসি, রয়টার্স ও অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উঠে আসে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিভ্রান্তিকর বার্তার বিশ্লেষণ।

এবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প কখনো যুদ্ধের নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়েছেন, আবার কখনও বলেছেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে বা আরও বাড়তে পারে। 

একই সঙ্গে তিনি ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনেও নিজের ভূমিকার কথা বলেছেন, যদিও প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার পরিবর্তনকে যুদ্ধের লক্ষ্য বলে অস্বীকার করেছে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের ৭৪ শতাংশ মনে করেন যুদ্ধের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি ট্রাম্প। আর ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ৯২ শতাংশ একই মত দিয়েছেন। তবে ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন ইরান অভিযানের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন ট্রাম্প। এক হাজার ২১ জনের ওপর জরিপটি চালায় রয়টার্স।

যুদ্ধ কতদিন চলবে

যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে—এ বিষয়ে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের বক্তব্য এক রকম নয়।

প্রথমদিকে ট্রাম্প বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, হামলা প্রায় চার সপ্তাহ চলতে পারে এবং পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।

ইরানে হামলা

 

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে চার থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে।

কিন্তু কয়েকদিন পরই ট্রাম্প আবার বলেন, তিনি চাইলে যুদ্ধ দীর্ঘায়ত করে ‘সবকিছু দখল করতে পারেন’, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অসীম অস্ত্র’ আছে, যা দিয়ে প্রয়োজনে ‘অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধ চালাতে পারে’ অথবা চাইলে ‘দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ করতে পারেন।’

অন্যদিকে গত সোমবার ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে গেছে’ এবং সামরিক দিক থেকে আর ‘হামলার জন্য তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই’।

কিন্তু একইদিনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যুদ্ধ কেবল শুরু—মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’

এমনকি প্রতিরক্ষা দপ্তরের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টেও লেখা হয়: ‘আমরা মাত্র লড়াই শুরু করেছি।’

যুদ্ধের কারণ 

ইরানের পারমানবিক স্থাপনা

 

ট্রাম্প ও তার প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ শুরুর বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন—ইরান নাকি পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করতে যাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর আসন্ন হামলার আশঙ্কা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, ইরানের ৪৭ বছরের কর্মকাণ্ডের প্রতিশোধ, খামেনি সরকারের পতন নিশ্চিত করা, ইরানি জনগণকে তাদের ভাগ্য নির্ধারণে সুযোগ দেয়া।

যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখনই এটাকে বড় সাফল্য বলতে পারি…অথবা আরও এগোতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত অভিযান চালাবে যুক্তরাষ্ট্র।’

ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের কাছ থেকে তিনি ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া কোনো চুক্তি গ্রহণ করবেন না। 

তবে প্রায় কাছাকাছি সময়ে তিনি অ্যাক্সিওস নিউজকে বলেন, ‘ইরানি নেতাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব, যদিও এটি খুব প্রয়োজনীয় নয়।’

অন্যদিকে হোয়াইট হাউস বলছে তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, সন্ত্রাসে সমর্থন বন্ধ করা ও ইরানের নৌবাহিনীকে অকার্যকর করা।

ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন

যুদ্ধ শুরুর একদিন পর ট্রাম্প ইরানের জনগণকে আহ্বান জানান নিজেদের সরকার বদলে ফেলতে।
কিন্তু কয়েকদিন পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই যুদ্ধের লক্ষ্য ইরানের সরকার পরিবর্তন নয়।

ইরানের নতুন নেতৃত্ব।

 

এরপর আবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের নতুন নেতা যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া টিকতে পারবেন না। 

ট্রাম্প আরও বলেন, সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণে তিনি নিজে ভূমিকা রাখতে চান।

এরপরই ইরান নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা ঘোষণা করে। 

এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, এই সিদ্ধান্তে হতাশ তিনি, কারণ এতে আবারও যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি 

হরমুজ প্রণালি নিয়ে গত মঙ্গলবার মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজকে সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পার করিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর পোস্টটি মুছে ফেলেন তিনি।

হরমুজ প্রণালি

 

পরে হোয়াইট হাউস জানায়, আসলে এমন কোনো এসকর্ট মিশন হয়নি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভুল ক্যাপশনের কারণে পোস্টটি দেওয়া হয়েছিল।

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দখলের সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি সতর্ক করেন, ইরান যদি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ২০ গুণ বেশি শক্তি দিয়ে আঘাত করবে।

কিন্তু, বাস্তবিকভাবে হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা অব্যাহত রেখেছে তারা।

তেলের বাজার

যুদ্ধের শুরুতে জ্বালানি তেলের দামকে রাজনৈতিক সাফল্যের সূচক হিসেবে তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, হামলার পর তেলের দাম তার প্রত্যাশার চেয়ে কম বেড়েছে এবং দ্রুত কমে যাবে।

তেলের দাম বেড়েছে।

 

কিন্তু বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো পদক্ষেপও নিয়েছে।

সম্প্রতি ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ উল্লেখ করে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে তার দেশের জন্য তা লাভজনক।

তেলের দামের চেয়ে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ঠেকানো তার কাছে বেশি জরুরি বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাশিয়ার ভূমিকা

সম্প্রতি রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে রাশিয়া।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন

 

প্রথমে ট্রাম্প প্রশাসন এই তথ্যকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে সরাসরি অস্বীকার করে।

ট্রাম্প বলেন, যদি রাশিয়া তথ্য দিয়ে থাকে, তাতে ইরানের কোনো লাভ হয়নি।

হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, রাশিয়া ফোনালাপে জানিয়েছে তারা কোনো গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের কথাই বিশ্বাস করছে।

ইরানের স্কুলে হামলা

যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনই ইরানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৭৫ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হয়। 
বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষ গণমাধ্যমে এ খবর এলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর টাইম ম্যাগাজিন ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, কোনো স্কুলে হামলার বিষয়ে তারা অবগত নন।

ইরানে স্কুলে হামলা

 

আর ট্রাম্প দাবি করেন, হামলাটি ইরানই করেছে। তিনি বলেন, ‘ওদের অস্ত্র খুবই দুর্বল, সম্ভবত ওরাই এই হামলা করেছে।’

এরপর ওই হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ পায়, যেখানে দেখা যায় একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র স্কুল ভবনে আঘাত করছে। 

এরপরও ট্রাম্প বলেন, এটি ইরানও ছুঁড়তে পারে।
তবে বাস্তবে টমোহক ক্ষেপণাস্ত্র কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কাছে রয়েছে। ইরানের কাছে কখনোই এই প্রযুক্তি ছিল না।

ইরান ও ফিফা বিশ্বকাপ

গত মঙ্গলবার ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চললেও ইরানি খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানানো হবে।

ফিফা বিশ্বকাপে ইরানি দল

 

দুই দিন পরই ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, ‘আমি মনে করি, নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার খাতিরে তাদের (ইরানের) এখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) আসা উচিত হবে না।’