ইরানে সরকার পতন নিশ্চিত নয়, শিগগির শেষ হচ্ছে না যুদ্ধ: ইসরায়েল
যৌথ সামরিক অভিযানের পরও ইরানে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নিশ্চয়তা দেখছে না ইসরায়েল। একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও তেল আবিব মনে করছে, এখনো এই যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার কাছাকাছি পৌঁছায়নি ওয়াশিংটন।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে আসা এসব তথ্য প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর দিনই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যেন ইরানের জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে পারে।
তিনি বিশেষভাবে কুর্দি, বেলুচ ও আরব সংখ্যালঘুদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তার এই বার্তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, এসব গোষ্ঠীর সম্ভাব্য বিদ্রোহ বা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
কিন্তু বাস্তবে টানা ১১ দিন তীব্র হামলা স্বত্ত্বেও ইরানে এখনো বিদ্রোহ বা গণঅভ্যুত্থানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রয়টার্স জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হন। একইসঙ্গে দেশটিতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং ঘরবাড়ি ও সরকারি ভবন ধ্বংস হয়েছে, যা অনেক ইরানির মধ্যে ক্ষোভও বাড়িয়েছে।
ইরানের পুলিশ বলছে, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে শত্রুর আহ্বানে কেউ রাস্তায় নামলে তাদের বিক্ষোভকারী নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ কারণে খামেনির মৃত্যুর খবরে কিছু মানুষ প্রকাশ্যে উল্লাস করলেও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়ে কেউ বিক্ষোভ করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক ইরানি রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছেন।
তেহরানের ২৬ বছর বয়সী বাসিন্দা আলি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি এই শাসনব্যবস্থাকে ঘৃণা করি এবং চাই এর শেষ হোক। কিন্তু বোমাবর্ষণের মধ্যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার মতো পরিস্থিতি নেই।’
তেহরানের রাস্তাঘাট তুলনামূলক শান্ত থাকলেও ব্যাংক, পেট্রল পাম্প ও দোকানপাট সীমিত সময়ের জন্য খোলা আছে এবং সরকারি অফিসও চালু আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ থাকলেও এখন অনেকের মধ্যে জাতীয়তাবোধ বাড়ছে এবং রেজা পাহলভি, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।’
এদিকে এই যুদ্ধের যৌথ লক্ষ্য কী ও কখন অভিযান শেষ হবে, তা নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে একক কোনো অবস্থান জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ শিগগিরিই শেষ হওয়ার কথা বললেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার যুদ্ধের সময়সীমা নির্ধারণে অস্বীকৃতি জানান।
বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে ইরানের সরকার টিকে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলি সামরিক কৌশল বিশেষজ্ঞ ও ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক আসাফ ওরিয়ন বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা যুদ্ধের একটি বাস্তব লক্ষ্য। তবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি করাটা পরোক্ষ লক্ষ্য, তাই সেটি বোঝা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, ‘সামরিক অভিযান পরিকল্পিতভাবে হতে পারে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ঘটতে মাস বা বছরও লেগে যেতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ইরানের স্থবির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলে অর্থনৈতিক সমস্যা ও ঘাটতির কারণে আবার বিক্ষোভ শুরু হতে পারে। তাই অনেক দিক থেকে ইরান হয়তো চায় যুদ্ধ কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হোক।’