নেপাল কি রাজা চায়?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘রাজা আও, দেশ বাঁচাও’—এমন আওয়াজ শোনা গেছে খোদ কাঠমান্ডুর কেন্দ্রস্থলে। ঘটনাটি ঘটেছিল এ বছর ভালোবাসা দিবসের আগের সন্ধ্যায়। আর সেই স্লোগানটি উঠেছিল সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র বীরবিক্রম শাহকে ঘিরে।

সবাই জানেন যে, সশস্ত্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে রাজা উৎখাত করে নেপাল গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। এখন সেখানেই ‘রাজা বাবু’র প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলছেন অনেকে। উদ্দেশ্যও বলে দিচ্ছেন তারা—‘দেশ বাঁচাও’।

অনেকের দৃষ্টিতে—এই দুই শব্দের মধ্য দিয়ে একদিকে খোলাসা হয়েছে রাজপন্থিদের গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে দেশ বাঁচানোর প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাহীনতা; অন্যদিকে, প্রকাশ্যে এসেছে দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের গণতান্ত্রিক চর্চায় চরম ব্যর্থতা।

সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘হিমালয়-কন্যা’ নেপাল নতুন পরিচিতি পেয়েছে ‘জেন জি বিপ্লবের দেশ’ হিসেবে। নতুন নাগরিকদের আন্দোলনে সেখানে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন হয় মেয়াদ পূরণে আগেই। তাই নতুন সরকারের আশায় আবারও ভোটবাক্সের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে নেপালবাসীকে।

চলতি শতকে যে কয়টি দেশে রাজতান্ত্রিক শাসকদের বিতাড়িত করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘটনা ঘটেছে, নেপাল এর অন্যতম। রাজা সরাতে প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধে অশান্ত-ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল এশিয়ার অন্যতম দারিদ্রপীড়িত দেশ নেপাল। রাজতন্ত্রবিরোধী সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনের কারণে রক্তাক্ত হয়েছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি।

অবশেষে, সেই আন্দোলন সফল হলে অবসান হয় নেপালের প্রায় আড়াই শ বছরের রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার।

২০০৮ সালের ২৮ মে ‘বিজয়ী’ নেপালে রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক অবসান হয়। দেশটিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হলেও নির্বাচিত রাজনীতিকরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে যে সফল হতে পারেননি, তা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনে অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।
ছবি: এপি

ইতিহাস বলছে—নেপালে গণতান্ত্রিক চর্চা এতটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে যে, গত ১৮ বছরে সেখানে ১৪ বার সরকার গঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ৯ জন। তাদের মধ্যে ৩ জনকে পদত্যাগের পর আবার বিভিন্ন সময় দায়িত্ব নিতে হয়েছিল।
অর্থাৎ, নেপালে কোনো প্রধানমন্ত্রীই ৩ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। সেখানে একজন প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার আনন্দময় মুহূর্ত এখনো অধরাই থেকে গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে হিমালয়ের দক্ষিণ সীমার দেশটিতে ২ দশকের কম সময়ের মধ্যে রাজতন্ত্রের ‘ফিরে আসার সম্ভাবনা’ নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।

আজ বুধবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘নেপালে নির্বাচন: ২ দশক আগে রাজা বিতাড়িত হওয়ার পরও রাজতন্ত্রের দাপট এখনো বিদ্যমান’।

প্রায় ২০ বছর আগে সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন, জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে প্রশ্ন রাখা হয়—রাজনৈতিক অস্থিরতায় নেপাল কি রাজাকে আবার ক্ষমতায় বসার সুযোগ দেবে?

প্রতিবেদন অনুসারে—গত ভালোবাসা দিবসের আগের সন্ধ্যায় নেপালের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে ভারতের সীমানা-ঘেঁষা ঝাপা জেলায় নিজের ব্যবসায়িক কাজ সেরে হেলিকপ্টারে রাজধানী কাঠমান্ডুতে ফিরছিলেন সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র বীরবিক্রম শাহ। তাকে সেখানে তাকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দেয় হাজারো জনতা।

সেসময় রাজভক্তরা স্লোগান দিয়েছিলেন—‘রাজা আও, দেশ বাঁচাও’।

নেপালের রাজতন্ত্রপন্থিদের মুখে এই স্লোগান আজ বেশি বেশি শোনা যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও জানা যায়—সেই ঘটনার চারদিন পর ও নেপালের গণতন্ত্র দিবসের একদিন আগে ৭৮ বছর বয়সী সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ এক ভিডিও বার্তায় নিজ দেশের ‘দুরবস্থা’ তুলে ধরেছিলেন।

বলেছিলেন, ‘দেশ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাময় পরিস্থিতিগুলো একটি পার করছে।’

তবে বক্তব্যে তিনি তুলে ধরেছিলেন আশার বাণীও।

বালেন নামে বেশি পরিচিত কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে ডামরু বাদ্যযন্ত্র বাজাতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
বালেন নামে বেশি পরিচিত কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে ডামরু বাদ্যযন্ত্র বাজাতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

অকালে ভোট

নিয়ম অনুসারে, নেপালে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বরে। কিন্তু, তা এগিয়ে আনতে হয়েছে। দরিদ্র দেশটির নব্য ক্ষমতাসীনদের বিলাসী জীবনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের নাগরিকরা রাজপথে নেমেছিল। পতন ঘটিয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির ক্ষমতাসীন জোটের।

সেই সরকারের প্রতি সমর্থন ছিল নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল)। কিন্তু, তরুণদের অনাস্থার কারণে তাদের ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল।

নেপালি সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুসারে, সেই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়ে ছিলেন ৭৭ জন এবং ধ্বংস হয়েছিল কয়েক বিলিয়ন ডলারের সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি।

আজ ৪ মার্চ তথা নির্বাচনের আগের দিন সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক ভোটার জানিয়েছে যে, এই ভোটে তাদের তেমন আগ্রহ নেই। চিকিৎসক রবীন্দ্র সিং ঠাকুরি এমন মনোভাবের ভোটারদের একজন।

তার মতে, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু ক্ষমতায় কয়েকটি নতুন মুখ দেখা যাবে।’

বিদ্যমান নির্বাচনী পরিস্থিতি তার উৎসাহ নষ্ট করে দিয়েছে বলেও গণমাধ্যমটিকে জানান তিনি।

১ মার্চ কাঠমান্ডুতে একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। ছবি: এপি
১ মার্চ কাঠমান্ডুতে একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। ছবি: এপি

আশাবাদী সাবেক রাজা

এত হিংসাত্মক গণআন্দোলনের ফল হিসেবে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাকে ঘিরে যদি ভোটারদের একাংশের এমন মনোভাব হয় তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি নয় কি?—এমন প্রশ্ন যেকোনো গণতন্ত্রমনা মানুষের মনে জেগে ওঠা স্বাভাবিক।

নেপালের মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি বিরূপ হলে সাবেক রাজার জন্য তা ‘শাপে বর’ হয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

কেননা, দেশটির বিরাজমান রাজনীতিতে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন বেশ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

অর্থাৎ, নেপালের মাটিতে ধীরে ধীরে বাড়ছে রাজতন্ত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষের সংখ্যা।

২০২২ সালের আইনসভা নির্বাচনে ২৭৫টির মধ্যে ১৪ আসন পাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির (আরপিপি) প্রধান রবীন্দ্র মিশ্র আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে।

বছর খানেক আগেও রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে কাঠমান্ডুতে সহিংস সমাবেশ দেখা গিয়েছিল। সেসময় রাজা-সমর্থকরা তাদের দেশে হিন্দু রাজাকে আবার ক্ষমতাসীন দেখতে চেয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন।

প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫১৬ বর্গ কিলোমিটারের দেশ নেপালের জনসংখ্যা ৩ কোটি ১১ লাখের বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু। দেশটিতে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির পাশাপাশি হিন্দু রাষ্ট্রের ভাবনাটিও সংবিধান থেকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন অনেকে নেপালকে আবারও হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দেখার দাবি তুলেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিকে লাল সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘জ্ঞানেন্দ্র শাহ ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। তিনি যেন সেই সুখস্মৃতি এখনো চারণ করেন। তিনি বিষয়টিকে আলোচনায় রাখতে চান।’

তবে নেপালে রাজতন্ত্র ফিরতে ঠিক কত দেরি বা আদৌ ফিরবে কিনা তা ভবিষ্যতের হাতেই তোলা থাকলো।