‘মোহাম্মদ দীপক বলছি…’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে যিনি নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ান, তিনিই তো নেতা। তবে এমন দুঃসাহসিক কাজ করেও কটু কথা শুনতে হচ্ছে তাকে। পাচ্ছেন হত্যার হুমকি। তিনি দীপক কুমার। ভারতের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছেন তিনি।

ভারতের উত্তরাখণ্ডের পৌরি গাড়ওয়াল জেলার ছোট শহর কোটদ্বারে উগ্রবাদী হিন্দুদের নিপীড়ন থেকে এক মুসলিম প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াতে গিয়ে দীপক কুমার নিজেকে পরিচয় দেন ‘মোহাম্মদ দীপক’ বলে। তার যায় কোথায়!

স্বধর্মের লোকদের বিরুদ্ধে তার এই ‘বিদ্রোহ’ একদিকে বিশ্বব্যাপী শান্তিবাদীদের আশার আলো দেখিয়েছে; অন্যদিকে, সেই দেশটির সাম্প্রদায়িক শক্তিকে করেছে আরও উচ্ছৃঙ্খল, উন্মত্ত।

ফিরে আসা যাক দীপক কুমার ওরফে মোহাম্মদ দীপকের ঘটনায়—

গত ২৬ জানুয়ারি জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সংখ্যালঘু সহনাগরিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দীপক কুমার।

সাম্প্রদায়িক ‘মব’-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনার ভিডিও চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার পর সংবাদের শিরোনাম হতে থাকেন ‘মোহাম্মদ দীপক’। ‘আমার নাম মোহাম্মদ দীপক’—এই চারটি শব্দ ছড়াতে শুরু করে দাবানলের মতো।

বিবিসির সৌজন্যে

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘নির্যাতিত মুসলিমের পাশে দাঁড়িয়ে নায়ক হলেন হিন্দু যুবক’।

এতে বলা হয়—৪২ বছর বয়সী জিম-মালিক দীপক কুমার তার মুসলিম প্রতিবেশী দোকানি ৬৮ বছর বয়সী ভাকিল আহমেদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সেদিন উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের কয়েকজন সদস্য ভাকিলকে ঘিরে ধরেছিল।

এই দলের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের হেনস্তার অভিযোগ আছে।

দীপকের ভাষ্য: ঘটনার দিনে তিনি ঘটনাস্থলের পাশে এক বন্ধুর দোকানে ছিলেন। হঠাৎ দেখেন, একদল মানুষ প্রবীণ ভাকিল আহমেদকে ‘জেরা’ করছে। তাদের দাবি, ভাকিলের দোকানের নাম ‘বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার’ বদলে ফেলতে হবে। গত প্রায় ৩০ বছর ধরে ভাকিল আহমেদ এই নামেই তার কাপড়ের দোকান চালাচ্ছেন।

দোকানের নামের শুরুতে যে ‘বাবা’ শব্দ আছে, তাতেই তাদের আপত্তি। ফারসি শব্দ ‘বাবা’ ভারতে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবাই ব্যবহার করেন। প্রাথমিকভাবে ‘বাবা’ শব্দ দিয়ে পিতা বা জন্মদাতাকে বোঝানো হলেও, বৃহত্তর অর্থে সম্মানিত প্রবীণজনকেও ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করা হয়।

কিন্তু বজরং দলের সদস্যদের দাবি, ‘বাবা’ বলতে শুধু তাদের ধর্মগুরুদেরই বোঝায়। তাই কোনো মুসলমানের অধিকার নেই তার দোকানের নামে ‘বাবা’ শব্দ ব্যবহার করার।

এমন সময় দীপক আসেন ঘটনাস্থলে। তিনি বিবিসি হিন্দিকে বলেন, ‘দোকানটির সামনে অনেক মানুষের জটলা ছিল।’

দীপক কুমার

প্রচারিত ভিডিওতে শোনা যায়, দীপক বলছেন—‘মুসলমানরা কি ভারতের নাগরিক নন?’

বিবিসিকে দীপক বলেন, ‘কয়েকজন তরুণ একজন প্রবীণের সঙ্গে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছিল, তা দেখে আমার ভালো লাগেনি। স্রেফ ধর্মের কারণে ওরা সেই ব্যক্তিকে হামলার লক্ষ্য বানিয়েছিল।’

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন ভাকিল। তার মতে, দীপক সে সময় ঘটনাস্থলে না এলে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বজরং দলের কর্মীরা দীপককে তার নাম জিজ্ঞেস করেন।

বিবিসিকে দীপক বলেন, ‘নিজেকে আমি মোহাম্মদ দীপক বলে পরিচয় দিই। আমি তাদের বলতে চেয়েছিলাম যে আমি একজন ভারতীয়। এটি ভারত এবং এখানে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবার বসবাসের অধিকার আছে।’

দীপকের দৃঢ়তায় বজরং দলের কর্মীরা সেখান থেকে সরে যান। কিন্তু কয়েক দিন পরই আরও লোকজন নিয়ে তারা ফিরে আসেন। সেদিন দেড় শর বেশি বজরং-সমর্থক দীপকের জিমের সামনে এসে হাঙ্গামা করেন।

সেই ঘটনার পর ভাকিল আহমেদ থানায় গেলে পুলিশ ‘কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির’ বিরুদ্ধে মামলা লেখে। অন্যদিকে, বজরং দলের দুজন সদস্য দীপকের বিরুদ্ধেও মামলা ঠুকে দেন।

হামলা-মামলা-প্রতিবাদ—সবকিছু নিয়েই সংবাদ প্রকাশিত হয় ভারতীয় গণমাধ্যমে।

দীপক কুমারের ইনস্টাগ্রাম থেকে

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রতিবাদী দীপককে ‘ভারত নেতা’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে এই ব্যক্তি ভারতের ‘সংবিধান ও মানবতা রক্ষায় লড়াই’ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তিনি লেখেন, দীপক ‘ঘৃণার বাজারে ভালোবাসা ছড়িয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আরও অনেক অনেক দীপক দরকার, যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। যারা ভয় পায় না। যারা সংবিধানের পাশে পূর্ণ শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারে।’

আরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপকের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তার সাহসের প্রশংসা করেছেন।

গত ২৯ জানুয়ারি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা দীপকের একটি ছোট ভিডিওতে ৫০ লাখের বেশি লাইক পড়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমি হিন্দু নই, মুসলমান নই, শিখ নই, খ্রিষ্টান নই। সবার আগে আমি মানুষ।’

একটি ‘ছোট’ ঘটনা এত দূর গড়াবে, তা দীপক ভাবতেও পারেননি। তার সোজাসাপ্টা কথা: তখন যা ভালো মনে হয়েছে, তাই করেছি। ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি যে এটা জাতীয় সংবাদে পরিণত হবে।

তবে তার সাহসিকতায় সবাই খুশি নন।

সমালোচকদের অনেকে দীপককে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে গালি দিচ্ছেন। হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। একজন ফোন দিয়ে বলেছে, ‘বজরং দল তোকে ছাড়বে না। উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে।’

এসব ঘটনায় দীপকের পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত। তিনি নিজেও ভয় পাচ্ছেন। প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়েছেন।

‘আজ আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকলে আগামী দিনে আমাদের সন্তানরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকাটাই শিখবে,’ বলেই মনে করেন দীপক। শত ঝঞ্ঝার পরও ভবিষ্যতে চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখলে ফের প্রতিবাদ করতে চান তিনি।

দীপক কুমারের ইনস্টাগ্রাম থেকে

সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দীপকের জিম একসময় বেশ জমজমাট ছিল। প্রতিদিন ১৫০ জনের বেশি মানুষ এসে ব্যায়াম করতেন। এখন তা কমে হয়েছে ১৫। ভয়ে অনেকে সেদিকে পা বাড়াচ্ছেন না।

দীপকের জিমের দুর্দশার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

স্থানীয় এক আইনপ্রণেতা দীপকের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি দীপকের জিমের সদস্য হয়েছেন

বলেছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দীপক ‘আশার আলো’। তার দেখাদেখি নতুন আরও অনেকেই দীপকের জিমের সদস্য হয়েছেন। একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা একজন ভালো মানুষকে হারতে দিতে পারি না।’

দীপকের মতো ভালো মানুষদের জয় হোক, দীপকের মতো ভালো মানুষদের জন্ম হোক—এমন বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে।