যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে ‘বিপাকে’ ভারত
চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে ভারত। এখন পর্যন্ত চুক্তির বিস্তারিত বিষয়গুলো জানা না গেলেও যতটুকু তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, তাতেই বিপাকে আছে সরকার।
নিজ দেশের জনগণের কাছে এই চুক্তির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যায় হিমশিম খাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার।
সমালোচকরা এই চুক্তিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত’ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বিচার শুল্ক যুদ্ধের রোষানল থেকে বাঁচতে এই চুক্তিতে রাজি হয় নয়াদিল্লি।
উদ্বেগে কৃষিখাত সংশ্লিষ্টরা
ঘোষিত চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের কৃষকদের সংগঠনগুলো। তাদের ভাষ্য—যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুলভে কৃষিপণ্য আমদানি করা হলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উল্লেখ্য, ১৪৭ কোটি মানুষ নিয়ে পৃথিবী সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে কৃষিখাতের ওপর ৭০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে।
মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক কৃষির ওপর নির্ভর করায় ভারত সরকারের কাছে কৃষি খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের এক যৌথ বিবৃতি ও হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমেই চুক্তি সম্পর্কে জানা যায়। নয়াদিল্লি বলছে—আগামী মার্চের শেষ নাগাদ অন্তর্বর্তী চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে চুক্তি বদলে যেতে পারে।
বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দাস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘ট্রাম্প-যুগে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই।’
তার মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি সই হলেও তা বেশিদিন বলবৎ নাও থাকতে পারে।
‘ট্রাম্প যেকোনো সময় যেকোনো ঘটনাকে অনিয়ম আখ্যা দিয়ে আবারও নতুন করে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন’, যোগ করেন তিনি।
‘অবাস্তব’ আমদানি লক্ষ্যমাত্রা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার অঙ্গীকারের কথা চুক্তিতে থাকতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে ভারত। সেখানে থেকে দ্বিগুণ বেড়ে বার্ষিক গড় আমদানি লক্ষ্যমাত্রা ১০০ বিলিয়ন করা হয়।
বার্ষিক আমদানি দ্বিগুণ করার অঙ্গীকারকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দেন নয়াদিল্লি-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব।
তবে আমদানির অঙ্গীকারের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে যাত্রীবাহী বোয়িং উড়োজাহাজ। শ্রীবাস্তব মনে করেন, রাতারাতি দেশটির বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ যেমন সম্ভব নয়, তেমনই শুধু বোয়িং কিনে এই লক্ষ্য পূরণও বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২০০টা বোয়িং কিনলেও এই লক্ষ্য পূরণ হবে না। প্রতিটি উড়োজাহাজের দাম ৩০০ মিলিয়ন ডলার ধরে হিসাব কষলেও তা মাত্র ৬০ বিলিয়নে পৌঁছায়।’
অঙ্গীকার নয়, ‘অভিপ্রায়’
কয়েকজন অর্থনীতিবিদ বলছেন, চুক্তির ভাষা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নয়াদিল্লির ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে। অর্থাৎ, ৫০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য পূরণে ভারতের ‘অভিপ্রায়’ আছে, কিন্তু তা পূরণে দেশটি ‘বাধ্য’ নয়।
গত শুক্রবার ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের কর্মকর্তা শিবান ট্যান্ডন সংবাদ সংস্থাটি বলেন, ‘এই লক্ষ্যকে অঙ্গীকারের বদলে অভিপ্রায় হিসেবে দেখানোয় পরবর্তীতে চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি কমেছে।’
‘খেয়ালি’ ট্রাম্প সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
সব মিলিয়ে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়টি ট্রাম্প নিজেই। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রবণতা অনেক দেশের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেও সে অবস্থান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। তিনি জানান, নয়াদিল্লি মস্কোর কাছ থেকে আর তেল কিনবে না, এমন প্রতিশ্রুতি তাকে দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন।
যৌথ বিবৃতিতে এই অঙ্গীকারের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এমনকি, বিষয়টি ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার বা অস্বীকার, কোনোটাই করেনি।
ভারত বরাবরই দাবি করে এসেছে, দেশের স্বার্থকে মাথায় রেখেই তারা বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে। রাশিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়।
তবে ইতোমধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কমিয়েছে ভারত। দিনে ২০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে গত জানুয়ারিতে ১১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে—ইতোমধ্যে তেল পরিশোধনকারী সংস্থাগুলো ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে তেল কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
আগামী এপ্রিল থেকে এই লাতিন আমেরিকার দেশটির তেল ভারতে পৌঁছাতে শুরু করবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ হবে কী না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
বিষয়টি মূলত নির্ভর করছে নায়ারা এনার্জি নামের এক প্রতিষ্ঠানের ওপর। এর আংশিক মালিকানা রুশ প্রতিষ্ঠান রসনেফট-এর। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার কাছ থেকে দৈনিক চার লাখ ব্যারেল তেল কেনা অব্যাহত রাখতে চায়।
সব মিলিয়ে অনেকের ধারণা—অনেকগুলো ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘হয়তো বা’ নির্ভর এই চুক্তি ভারতবাসীর জন্য ‘গলার কাটা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার সব শর্ত মেনে ওয়াশিংটনের কাছে ‘মাথা নত’ করলেও ট্রাম্প যে তুষ্ট হবেন, এরও নিশ্চয়তা নেই।
এককালের ‘ডিয়ার ফ্রেন্ড’ মোদির ওপর নেমে আসতে পারে নতুন নতুন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার খড়গ, এমন মতও অনেক বিশেষজ্ঞের।


