ঢাকার আইসিইউতে ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক
রাজধানীর ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ছড়িয়ে পড়েছে ক্যানডিডা অরিস নামে এক ছত্রাক। গবেষকরা বলছেন, এটি একটি সুপারবাগ এবং সহজে নিরাময়যোগ্য না।
এটি মানবদেহে প্রতিরোধ তৈরি করে, ফলে ওষুধ অকার্যকর হয়ে পড়ে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, আইসিইউতে থাকার কোনো এক পর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগী এই সুপারবাগে সংক্রমিত হয়েছেন। এসব রোগী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, আইসিইউতে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছেন এবং তাদের জন্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা সেন্ট্রাল ও ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার বেশি। সরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৩ শতাংশ রোগী আইসিইউতে থাকাকালে সি. অরিস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে এই সুপারবাগের সংক্রমণ ০ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম।
সম্প্রতি মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। আইসিডিডিআর,বি ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে।
গবেষণায় সহযোগিতা করেছে আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং কারিগরি সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাসে মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এর আগে পরিচালিত গবেষণায় এনআইসিইউতে (নবজাতক আইসিইউ) এই ছত্রাকের বিস্তার দেখা গিয়েছিল। তবে এবার নতুন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এই ‘সুপারবাগ’ আরও বিস্তৃত হয়েছে। অন্যান্য আইসিইউতে প্রভাব বিস্তার করছে। এছাড়া গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।
রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি নেওয়ার পরপরই ভিটেক-২ পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়—তাদের ত্বকে ক্যানডিডা অরিস রয়েছে কি না অথবা রক্তে সংক্রমণ হয়েছে কি না?
ক্যানডিডা অরিস উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে বসবাস (কলোনাইজেশন) করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি
রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। গুরুতর অসুস্থ রোগী ও যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
দুর্বল, তাদের জন্য এই ছত্রাক বেশি ক্ষতিকর। এছাড়া, প্রায় সব ধরনের সি. অরিস সাধারণত ব্যবহৃত
অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় এর চিকিৎসা বেশ কঠিন।
এ কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ ক্যানডিডা অরিসকে গুরুতর স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা
করছে।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, সব সি. অরিস জীবাণু ফ্লুকোনাজলের (ছত্রাকরোধী ওষুধ) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একটি বাদে প্রায় সব জীবাণুই ভরিকোনাজলের (অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ) বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। অর্থাৎ ওষুধ ব্যবহার করে জীবাণু ধ্বংস করা যাচ্ছে না।
ফ্লুকোনাজল ও ভরিকোনাজল সাধারণত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যাচ্ছে, একাধিক ওষুধ কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে অকার্যকর ছিল। যে কারণে সংক্রমণের চিকিৎসা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন আইসিডিডিআর,বির ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ড. ফাহমিদা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ক্যানডিডা অরিস সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশের জন্যই একটি বড় হুমকি।’
‘আমরা হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি এবং সচরাচর
ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখতে পাচ্ছি,’ যোগ করেন তিনি।
ফাহমিদা বলেন, ‘নির্বাচিত কিছু নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইসিইউগুলোতে পাওয়া সি. অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এই ছত্রাক এখন এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে—বাইরের দেশ থেকে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়।’
সংক্রমিত বা জীবাণু বহনকারী রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করতে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান নিয়মিত ও যথাযথভাবে ক্লোরিনভিত্তিক কার্যকর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা; স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটগুলোতে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালুর সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
পাশাপাশি, অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সংযত ও যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
গবেষকরা মনে করেন, সারা দেশের চিত্র বোঝার জন্য বৃহৎ পরিসরের গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।