নারীরা কেন পুরুষের তুলনায় বেশি মাইগ্রেনে ভোগেন, যা বলছে গবেষণা
আগের অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মাইগ্রেন হওয়ার সম্ভাবনা পুরুষদের তুলনায় তিনগুণ বেশি। তবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের একটি গবেষণা বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি সময় ধরে মাইগ্রেনে ভোগেন।
ডিসেম্বরে দ্য ল্যানসেট নিউরোলজিতে প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৮টি দেশের ৪১ হাজার পুরুষ ও নারীর মাথাব্যথার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আগে গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে মাইগ্রেন বেশি হয়। কিন্তু এই গবেষণার লক্ষ্য ছিল, নারীরা দীর্ঘ সময় ধরে মাইগ্রেনে ভোগেন কি না তা বের করা।
এই গবেষণার প্রধান গবেষকদের একজন নরওয়ের হেডেক রিসার্চ সেন্টারের পোস্টডক্টরাল ফেলো আন্দ্রিয়াস কাত্তেম হুসয়। তিনি বলেন, 'কতজনের মাইগ্রেন হয়, এটা থেকে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের অবশ্যই জানতে হবে, এই রোগটি ওই ব্যক্তির ওপর কতটা প্রভাব ফেলে।'
গবেষকরা এই গবেষণায় রোগীদের সার্ভে তথ্য ব্যবহার করেছেন। যেখানে তারা মাইগ্রেনের সময়কাল ও কতবার হয় তা লিপিবদ্ধ করেন। এবারই প্রথমবারের মতো তারা বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী মাইগ্রেনের সময়কাল বিশ্লেষণ করেছেন। ফলাফল দেখায়, পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সময় মাইগ্রেনে ভুগছেন নারীরা।
সময়কাল বিবেচনায় এই গবেষণা দেখায়, 'নারীদের ব্যথা পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।'
কিন্তু এই পার্থক্যের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
মাইগ্রেন কী, কেন হয়
ড্যানিশ হেডেক সেন্টারের গবেষক মেসৌদ আশিনা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে বলেন, অনেকে ভাবেন মাইগ্রেন কেবল মাথাব্যথা, তবে এটি পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ মাইগ্রেনের সময় অনেকের বমি বমি ভাব হয় বা বমি হয় এবং ক্লান্তি অনুভব করেন। কেউ কেউ আলো ও গন্ধের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়েন।
মাইগ্রেন কেন হয় তা পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষকরা মনে করেন, আমাদের মস্তিষ্কের ট্রাইজেমিনোভাসকুলার সিস্টেমে মাইগ্রেন হয়। এটি মূলত একটি জাল, যা মস্তিষ্কের স্নায়ু, কোষ ও রক্তনালীকে যুক্ত করে। যখন এই রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়, তখন মাথাব্যথা হয়।
ভিন্ন ভিন্ন কারণে মাইগ্রেন হতে পারে। এর পেছনে জেনেটিক্স, খাদ্যাভ্যাস, অল্প ঘুম বা হরমোন প্রভাব ফেলে। কিছু মানুষ অতিরিক্ত ওষুধ নেন। যার কারণে 'মেডিকেশন ওভারইউস হেডেক' নামের অতিরিক্ত মাথাব্যথা হতে পারে।
আন্দ্রিয়াস কাত্তেম হুসয়ের গবেষণা অনুযায়ী, সঠিকভাবে ওষুধ নিলে প্রায় ২০ শতাংশ মাথাব্যথা এড়ানো সম্ভব।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজিস্ট অ্যাডি পেরেটজ জিওগ্রাফিকে বলেন, নারীদের বেশি সময় মাইগ্রেনে ভোগার একটি কারণ হতে পারে হরমোন। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মাইগ্রেনে হরমোন প্রভাব ফেলে।
নারীরা কেন বেশি সময় মাইগ্রেনে ভোগেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এই পার্থক্য অন্তত কিছুটা হরমোনের কারণে হয়।'
বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়ে কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। সেগুলোও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটি প্রতিবেদনে।
ইস্ট্রোজেন হ্রাস তত্ত্ব
ইস্ট্রোজেন হলো মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ১৯৭২ সালে ইস্ট্রোজেন হ্রাস তত্ত্ব প্রথমে উত্থাপিত হয়। নিউরোলজিস্ট ব্রায়ান সোমারভিল ১৬৬৬ সালের একটি ঘটনার কথা জানেন, তখন এক নারী পিরিয়ডের সময় মাইগ্রেনে ভুগছিলেন। তিনি একটি ছোট গবেষণা চালান ও দেখান যে, যখন শরীরে ইস্ট্রোজেন কমে যায়, তখন মাইগ্রেন শুরু হতে পারে।
এরপর অনেক নিউরোলজিস্ট আরও বড় গবেষণা চালান।
তার আগে ১৯৬২ সালের গবেষণায় ছেলে-মেয়েদের মাইগ্রেন নিয়ে তথ্য নেওয়া হয়। দেখা যায়, ১০ বছর বয়সের আগে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মাইগ্রেন প্রায় সমানভাবে হয়। কিন্তু ১০ বছর পর, মেয়েদের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক অন্যান্য গবেষণাতেও দেখা যায়, তারুণ্যের সময়ের সঙ্গে মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
অ্যাডি পেরেটজ বলেন, 'পিরিয়ড শুরু হলে মাইগ্রেনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পিরিয়ড চলাকালীন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা ওঠানামা করে। আবার পিরিয়ড শুরুর ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়।'
কিছু গবেষণা দেখায়, নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ও মাইগ্রেনকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে সাধারণত মাইগ্রেন থেকে মুক্ত থাকেন, কারণ তখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকে।
বিপরীতে, পেরিমেনোপজে নারীদের ইস্ট্রোজেনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।
'এই সময়ে মাইগ্রেন আরও খারাপ হতে পারে,' বলেন পেরেটজ।
তবে সব মাইগ্রেনের জন্য ইস্ট্রোজেনের ওঠানামাকে দায়ী করা যায় না। কারণ অনেক নারী পিরিয়ড চক্রের বাইরে মাইগ্রেনে ভোগেন এবং লাখ লাখ পুরুষও মাইগ্রেনে ভোগেন।
ড্যানিশ হেডেক সেন্টারের গবেষক মেসৌদ আশিনা ২০২৩ সালে একটি গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ইস্ট্রোজেন হ্রাস তত্ত্ব যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য হলেও এটি নিয়ে সীমিত গবেষণা হয়েছে।
আশিনার দল বর্তমানে মাইগ্রেনের আণবিক কারণ খুঁজছে এবং ভবিষ্যতে নারীদের ওপর এগুলো পরীক্ষার পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, 'মানুষের শরীরে অনেক কিছু ঘটছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অণু বা মলিকিউল জড়িত থাকতে পারে।'
আরও গবেষণা প্রয়োজন
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, যদিও স্পষ্ট তথ্য আছে, নারীদের মধ্যে মাইগ্রেন বেশি হয়। তবে এটি নিয়ে খুব কম গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মাইগ্রেন নারীদের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে।
আগে, মাইগ্রেনে ভুগছেন এমন নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের প্রাক্তন প্রধান নিউরোলজিস্ট ড. হ্যারল্ড গ. উলফ নারী ও পুরুষের মাইগ্রেন ভিন্নভাবে নির্ণয় করতেন। তাকে 'আধুনিক হেডেক গবেষণার জনক' বলা হয়।
২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হ্যারল্ড গ. উলফ নারীদের মাইগ্রেনকে একটি 'মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা' হিসেবে দেখতেন। ফলে মানুষ ভাবতেন, নারীদের মস্তিষ্ক 'দুর্বল'। আর এ কারণে নারীদের মাইগ্রেনকে তখন কম গুরুত্ব দেওয়া হতো।
এই ভাবনা দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলেছে। আজও নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে কম গবেষণা হচ্ছে এবং আর্থিক বরাদ্দও কম।
হুসয় বলেন, এই ভারসাম্যহীনতা কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো গবেষণা। মাথাব্যথার রোগগুলো বিশ্বব্যাপী শীর্ষে আছে। ৩০ বছর বয়স থেকে নারী-পুরুষের মধ্যে মাইগ্রেন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এছাড়া নারীদের পেরিমেনোপজের সময় মাইগ্রেন তীব্র হয়।
গবেষণার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, পুরুষ ও নারীদের মধ্যে মাইগ্রেনের প্রভাব আলাদা। হুসয় আশা করেন, তার সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এই পার্থক্য আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
গবেষণা নারীদের জন্য আরও ভালো চিকিৎসার পথও খুলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।