দেশে ইরেকটাইল ডিসফাংশন থাকা ৮০ ভাগ পুরুষের উচ্চ রক্তচাপ: জরিপ
বাংলাদেশে ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা উত্থানজনিত সমস্যায় ভোগা বয়স্ক পুরুষদের প্রায় ৮০ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপের রোগী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষদের এই সমস্যাটিকে কেবল যৌন স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং একে ভবিষ্যতের হৃদ্রোগের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গতকাল শনিবার এক সেমিনারে ঢাকার একটি উপজেলার ওপর পরিচালিত গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। আজ ‘বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ওই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারটিতে চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আবুল কালাম আজাদ ঢাকার দোহার উপজেলার ছয়টি গ্রামের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন।
বিবাহিত ৩৮৪ জন বয়স্ক পুরুষের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, তাদের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যেই কোনো না কোনো মাত্রায় ইরেক্টাইল ডিসফাংশন (উত্থানজনিত সমস্যা) রয়েছে। এই সমস্যায় ভোগা পুরুষদের ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
অধ্যাপক আজাদ বলেন, ‘যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের ঝুঁকি প্রায় চার গুণ বেশি। আর উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি।’
এই সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পুরুষের পেনাইল ধমনি (রক্তনালি) মাত্র ১-২ মিলিমিটার চওড়া হয়। অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনি ৩-৪ মিলিমিটার চওড়া। এর অর্থ হলো, রক্তনালিতে কোনো ব্লক বা জটিলতা থাকলে হৃদ্রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই উত্থানের সমস্যার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ইরেক্টাইল ডিসফাংশন আগেভাগে চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিতে পারলে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।’
উচ্চ রক্তচাপ এখন ‘নীরব ঘাতক’
বিশ্বব্যাপী এখন মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে বিএমইউর প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুল হক উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি সরাসরি হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং কিডনির জটিলতার সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরমেটিকস বিভাগের চিকিৎসক ফারজানা ইসলাম ও শহীদুল হক জানান, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাদের অনেকেই নিজেদের এই রোগ সম্পর্কে জানেন না।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, কায়িক পরিশ্রম, ধূমপান পরিহার এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়।
সেমিনারে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ বা ২ কোটি ২৮ লাখ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই হয় অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এ ছাড়া এই রোগের কারণে অকালমৃত্যুর হার ৫১ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের (৪১ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘অসংক্রামক ব্যাধির এত বড় বোঝা থাকা সত্ত্বেও দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ দেওয়া হয়।’
জাকির হোসেন জানান, বর্তমানে সারা দেশে ৪৪৬টি এনসিডি কর্নার রয়েছে। ডিজিটালি ৯ লাখ ১৮ হাজারের বেশি উচ্চ রক্তচাপের রোগী এবং ৭ লাখ ৩১ হাজার ডায়াবেটিস রোগীকে নিবন্ধিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত ছয় বছরে দেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশকে একটি ‘সাফল্যের গল্প’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।’
রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ কোম্পানি এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক রিয়াদ আরেফিন জানান, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে তারা দেশের সব এনসিডি কর্নারে ওষুধ সরবরাহ করছেন। ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে তিনি আগে থেকে চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়ার অনুরোধ জানান।