পিঁপড়াকে ফাঁদে ফেলে জালে আটকায় যে মাকড়সা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

নানান বিস্ময়ে ভরা আমাদের এই প্রকৃতি। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত এমন সব প্রাণীর সন্ধান পাচ্ছেন, যাদের আচরণ অবাক করে দিচ্ছে সবাইকে। এবার অস্ট্রেলিয়ার রেইনফরেস্টে সন্ধান মিলেছে নতুন প্রজাতির এক মাকড়সার। বিজ্ঞানীরা আপাতত এর নাম দিয়েছেন ‘ব্যালিস্টা স্পাইডার’।

এ ধরনের নামকরণের পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। এই শিকার ধরতে একটি ফাঁদ তৈরি করে, যা অনেকটা প্রাচীন যুদ্ধাস্ত্র ব্যালিস্টার মতো। এই ফাঁদ শিকারকে দ্রুত গতিতে মাকড়সার জালের দিকে ছুড়ে দেয়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মাকড়সার একমাত্র লক্ষ্য গ্রিন ট্রি অ্যান্ট বা সবুজ পিঁপড়া।

Close-up of a small spider on a leaf against a white background. Spider has yellowish brown legs and head with a larger green back.
ব্যালিস্টা মাকড়সাটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৩ থেকে ৫ মিলিমিটার। তবে এর জালের নকশা এমনভাবে তৈরি, যাতে টানটান স্প্রিংয়ের মতো শক্তি জমা থাকে। ছবি: সংগৃহীত

এই পিঁপড়াকে শিকার করা সহজ নয়। এদের কামড় অত্যন্ত শক্তিশালী। এমনকি বিপদের সময় তারা অ্যাসিড ছিটিয়ে দিতে পারে। তাই বেশির ভাগ শিকারিই এদের এড়িয়ে চলে।

কিন্তু ব্যালিস্টা স্পাইডার ঠিক উল্টো কাজ করে। সে এই ভয়ংকর পিঁপড়াকেই শিকার বানায়। অন্য কোনো পোকামাকড় নয়, কেবল এই এক প্রজাতির পিঁপড়াকেই লক্ষ্য করে ফাঁদ পাতে তারা।

২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপের রেইনফরেস্টে মাকড়সা নিয়ে গবেষণা করছিলেন জীববিজ্ঞানী ও মাকড়সা বিশেষজ্ঞ গ্রেগ অ্যান্ডারসন। সেখানেই তিনি অবাক করা একটি দৃশ্য দেখেন।

A close up of a leaf an ant approaches a cone of spider web while a spider hovers above.
প্রথমে পাতা, ডাল বা মাটিতে রেশমের সুতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে মাকড়সাটি। তারপর সেখান থেকে টানটান সুতা বুনে ফাঁদ তৈরি করে। ছবি: সংগৃহীত

একটি ছোট মাটির রঙের মাকড়সা নিজের জাল থেকে পাতায় আশ্রয় নিলো। তারপর সেখানে রেশমের সুতা দিয়ে আটকে দিল। এরপর বারবার একই কাজ করে সুতাটি আরও শক্ত ও টানটান করল। সব প্রস্তুতি শেষে আবার জালে ফিরে যায়। এরপর সেখানে অপেক্ষা করছিল মাকড়সাটি।

কিছুক্ষণ পর একটি পিঁপড়া সেই পাতায় ওঠে। সুতা দেখে পিঁপড়াটি কামড়ে কামড়ে কাটতে শুরু করে।

আর ঠিক তখনই ঘটল বিস্ময়কর ঘটনা!

সুতা ছিঁড়ে যেতেই পিঁপড়াটি গুলির গতিতে গিয়ে পড়ল মাকড়সার জালের মধ্যে। তারপর জালে আটকে যত ছটফট করছিল, তত জড়িয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয় মাকড়সার রাতের খাবার।

ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে, ঠিক কী হলো তা খালি চোখে বোঝাই কঠিন।

পরে গবেষকরা আবার সেখানে ফিরে যান। এবার তাদের সঙ্গে ছিল অত্যাধুনিক হাই-স্পিড ক্যামেরা। রাতের অন্ধকারে মাকড়সার শিকার ধরার পুরো ঘটনাটি ভিডিও করা হয়।

A rainforest canopy at night.
অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের দুর্গম রেইনফরেস্টে এই নতুন প্রজাতির মাকড়সার সন্ধান মিলেছে। ছবি: সংগৃহীত

ভিডিও বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অবাক হন।

একজন গবেষকের ভাষায়, ‘একটি ফ্রেমে পিঁপড়াটি ছিল। পরের ফ্রেমেই আর নেই!’

গবেষণায় দেখা গেছে, এই রেশমের ফাঁদ তার ওজনের তুলনায় বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এক কেজি এমন রেশমের ফাঁদ প্রায় ১২ মেগাওয়াট শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।

আরও অবাক করা তথ্য হলো, এই ফাঁদ পিঁপড়াকে ঘণ্টায় নয়, সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ৩৬৭ মিটার গতিতে ছুড়ে দেয়। গবেষকদের হিসাবে, এটি একটি রাইফেল থেকে ছোড়া গুলির গতির প্রায় দেড় গুণ।

বিজ্ঞানীদের বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।

তাদের ধারণা ছিল, হয়তো অন্য পোকামাকড়ও এই ফাঁদে ধরা পড়ে। কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কেবল পিঁপড়া ফাঁদের সুতায় কামড় দেয় এবং শিকার হয়।

অন্য কোনো কীটপতঙ্গ এই ফাঁদের প্রতি আগ্রহ দেখায় না।

A camera setup in the rainforest at night.
কুকটাউনের কাছের বনাঞ্চলে টানা ১০ দিন ধরে খুঁজে অবশেষে এই মাকড়সার নমুনা পান গবেষকরা। ছবি: সংগৃহীত

প্রাণিজগতে কোনো শিকারির কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল হওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

এখন প্রশ্ন হলো, কেবল পিঁপড়াই কেন এই ফাঁদে আকৃষ্ট হয়?

বিজ্ঞানীদের ধারণা, মাকড়সাটি হয়তো ফাঁদের সুতায় বিশেষ ধরনের রাসায়নিক বা ফেরোমোন লাগিয়ে দেয়। সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পিঁপড়ারা সুতাটিকে আক্রমণ করে। আর সেই আক্রমণই শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এ ধারণা এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি। গবেষকেরা এখন সেই রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণের কাজ শুরু করতে চান।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজিতেতে।

বিজ্ঞানীরা এখনো মাকড়সাটির আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক নাম নির্ধারণ করেননি। পাশাপাশি প্রাণিজগতের বিবর্তনীয় ইতিহাসে এর অবস্থানও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

গবেষকদের বিশ্বাস, প্রকৃতির দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকালে এমন আরও অসংখ্য বিস্ময় আমাদের সামনে আসবে। হয়তো এই মাকড়সাটিও বছরের পর বছর মানুষের চোখের সামনেই ছিল। কিন্তু কেউ খেয়াল করে দেখেনি।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক