অ্যালবিনিজম কী, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে’ নিয়ে কেন এত আলোচনা?
সাধারণত মহিষের গায়ের রং কালো হয়। কিন্তু, আলোচিত এই মহিষের গায়ের রং অনেটা গোলাপি। মাথায় সোনালি চুল। এমন অবয়বের মহিষ দেখে মনে পড়তে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হেয়ারস্টাইলের কথা।
ব্যস, নাম হয়ে গেল ‘ট্রাম্প মহিষ’! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে গেল। প্রতিবেদন হলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।
কেন এই মহিষ নিয়ে এত আলোচনা? কারণ, এর গায়ের রং। এটি একটি বিরল ঘটনা। আর এ কারণেই মহিষটিকে নিয়েই এত কৌতূহল। বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় অ্যালবিনিজম।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, এই মহিষটিকে কোরবানির জন্য প্রতিপালন করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। বরং সরকারের পক্ষ থেকে প্রাণীটির প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের ভাষ্য, বিরল বৈশিষ্ট্যের কারণে মহিষটি জীব-বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রাণী সংরক্ষণ করা পরিবেশ ও জিনগত বৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন হলো, অ্যালবিনো প্রাণী আসলে কী? আর কেনই বা এমন হয়? কেন তাদের ঘিরে এত রহস্য, ভয় ও কুসংস্কার?
অ্যালবিনিজম কী
অ্যালবিনিজম হলো শরীরে জিনের প্রভাব। এই জিনের প্রভাবে শরীরে ‘মেলানিন’ রঞ্জক পদার্থ কম তৈরি হয় বা একেবারেই হয় না। মেলানিন কী?
সহজভাবে বলা যায়, মেলানিন হচ্ছে শরীরের ‘প্রাকৃতিক রঙের কারখানা’। মানুষের শরীরে এক বিশেষ ধরনের কোষ আছে, এদের বলা হয় মেলানোসাইট। এই কোষগুলোই মেলানিন তৈরি করে।
মেলানিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে—ত্বকের রং ঠিক করা, অর্থাৎ, ত্বকের রং হালকা হবে নাকি গাঢ়; এটি চুল-লোমের রঙ ঠিক করে। এমনকি, চোখের মণির রং-ও নির্ভর করে এর ওপর।
এর পাশাপাশি মেলানিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সূর্যের ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট (ইউভি) অতিবেগুনি রশ্মি থেকে শরীরকে রক্ষা করা। এটি অনেকটা প্রাকৃতিক সানস্ক্রিনের মতো কাজ করে।
কিন্তু, অ্যালবিনিজমের কারণে মেলানিন খুব কম তৈরি হয় বা একেবারেই হয় না। ফলে শরীর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতি থেকে যথেষ্ট সুরক্ষা পায় না। এর কারণে অ্যালবিনো মানুষ ও প্রাণীদের ক্ষেত্রে কিছু স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়।
যেমন—ত্বক সহজেই রোদে পুড়ে যেতে পারে, দীর্ঘদিন সূর্যের সংস্পর্শে থাকলে ত্বক-ক্যানসারের ঝুঁকি ও অতিরিক্ত আলোর কারণে চোখ সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—মেলানিন যেহেতু অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে ত্বককে রক্ষা করে, তাই এটি না থাকলে বা কম থাকলে ত্বকের কোষ সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ক্ষতিগ্রস্ত কোষ দীর্ঘ সময় পরে ক্যানসারের রূপ নিতে পারে।
যেহেতু মেলানিন শরীরের রং নির্ধারণ করে তাই অ্যালবিনিজমের কারণে প্রাণী বা মানুষের শরীর অস্বাভাবিক সাদা বা ফ্যাঁকাসে দেখায়। অনেক সময় চোখও গোলাপি বা লালচে দেখায়, কারণ চোখের রক্তনালীগুলো তখন বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। শ্বেতাঙ্গ বা ককেশীয় অঞ্চলের মানুষদের শরীরে মেলানিন কম থাকে।
তবে সব সাদা প্রাণীই অ্যালবিনো নয়। কিছু প্রাণীর গায়ের রং স্বাভাবিকভাবেই হালকা হয়। আবার লিউসিজম বা ইসাবেলিনিজমের কারণেও একটি প্রাণীকে সাদা দেখাতে পারে।
অ্যালবিনো প্রাণীদের জীবন কেন কঠিন
প্রকৃতিতে অ্যালবিনো প্রাণী খুবই বিরল। তাদের জীবনযাপনও সহজ নয়।
অনেক অ্যালবিনো প্রাণীর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়। ফলে খাবার শিকার বা শিকারির হাত থেকে পালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু, তাদের সাদা শরীর সহজেই চোখে পড়ে যায়। যেমন, অ্যালবিনো কুমির বা অ্যালিগেটর খুব ছোট থাকতেই অন্য প্রাণীর শিকার হয়।
অ্যালবিনো প্রাণীরা শুধু প্রকৃতির ঝুঁকিতেই নয়, মানুষের কারণেও বিপদে পড়ে। বিরল প্রাণী পোষার শখ বা তাদের শরীরের অংশ সংগ্রহের জন্য অনেক সময় পাচারকারীরা এসব প্রাণী ধরে নিয়ে যায়।
এ কারণে ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপে অ্যালবিনো ওরাংওটাংয়ের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছিল একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত অ্যালবিনো প্রাণীদের একটি ছিল স্নোফ্লেক নামের এক গরিলা। একে বার্সেলোনার চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছিল। একে নিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনে প্রতিবেদন। পরে অতিরিক্ত সূর্যালোকের কারণে ত্বক-ক্যানসারে মারা যায় গরিলাটি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ডের ওলনি শহরে প্রায় একশো অ্যালবিনো কাঠবিড়ালির একটি দল আছে। শহরের মানুষ তাদের এত ভালোবাসে যে, গাড়িচাপা থেকে বাঁচাতে বিশেষ আইন করা হয়েছে।
শুধু প্রাণী নয়, মানুষও অ্যালবিনো হয়
অ্যালবিনিজম শুধু প্রাণীদের নয়, মানুষের মধ্যেও দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অ্যালবিনিজমের অন্তত পাঁচটি জিনগত ধরন জানা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো ওসিএ১ (Oculocutaneous Albinism Type 1) ও ওসিএ২ (Oculocutaneous Albinism Type 2)।
ওসিএ১-এ টিওয়াইআর নামের একটি জিনে সমস্যা থাকে। এই জিন টাইরোসিনেজ (tyrosinase) নামের একটি এনজাইম তৈরি করে, যা রং তৈরিতে সাহায্য করে।
ওসিএ২ সাধারণত আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানবজাতির প্রাচীন ইতিহাসের সম্পর্ক থাকতে পারে।
অ্যালবিনো মানুষের অনেকেই দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভোগেন। তাদের চোখে নিস্ট্যাগমাস (Nystagmus) দেখা যায়—মানে চোখ অনবরত কাঁপতে থাকে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা কম থাকায় ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও বেশি থাকে।
আফ্রিকার কুসংস্কার
পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চলে অ্যালবিনো মানুষদের নিয়ে ভয়াবহ কুসংস্কার রয়েছে।
দক্ষিণপূর্ব আফ্রিকায়, বিশেষ করে, জিম্বাবুয়ে, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও তানজানিয়াতে বহু অ্যালবিনো মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। সেখানে অনেকের বিশ্বাস, অ্যালবিনোদের শরীরের অংশ সৌভাগ্য বা ধনসম্পদ এনে দেয়।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, কখনো পরিবারের সামনেই অ্যালবিনো মানুষের হাত-পা বা শরীরের অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে।
এই ভয়ংকর বাস্তবতার বিরুদ্ধে কাজ করছেন কানাডিয়ান মানবাধিকারকর্মী পিটার অ্যাশ। তার প্রতিষ্ঠিত ‘আন্ডার দ্য সেম সান’ সংগঠনটি আফ্রিকায় অ্যালবিনোদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কাজ করছে।
সিনেমা থেকে ছড়িয়েছে ভুল ধারণা?
সিনেমা ও গল্প-উপন্যাসে অ্যালবিনো চরিত্রকে রহস্যময় বা ভয়ংকর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ড্যান ব্রাউনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য দা ভিঞ্চি কোড’ ও পরবর্তী চলচ্চিত্রে সাইলাস নামের অ্যালবিনো চরিত্রকে ভয়ংকর ও সহিংস হিসেবে দেখানো হয়। তার সাদা চেহারা ও লালচে চোখকে রহস্যের প্রতীক বানানো হয়েছিল।
অনেক অ্যালবিনো অধিকারকর্মী মনে করেন, এমন চরিত্র সাধারণ মানুষের মনে অ্যালবিনোদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।
‘দ্য ম্যাট্রিক্স রিলোডেড’ সিনেমায় সাদা চুল ও ফ্যাকাশে ত্বকের দুই যমজ চরিত্রকে অস্বাভাবিক ও ভীতিকর হিসেবে দেখানো হয়েছে। তারা দেওয়ালের ভেতর দিয়ে যেতে পারত এবং অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিল।
এ ছাড়াও, ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পাওডার’ চলচ্চিত্রে সাদা চেহারার এক তরুণকে সমাজ কীভাবে ভয় পায় ও দূরে সরিয়ে রাখে, তা দেখানো হয়েছে। যদিও সিনেমাটিতে সহানুভূতির বার্তা আছে, তবুও এটি আবার ‘ভিন্ন চেহারা মানেই অদ্ভুত’ ধারণাকে সামনে আনে।
হারমান মেলভিলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মবি ডিক’-এ বিশাল সাদা তিমিটিকে রহস্য ও ভয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সাহিত্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পশ্চিমের সাহিত্যে ‘সাদা’কে অনেক সময় অস্বাভাবিক শক্তির প্রতীক বানানো হয়েছে।
এই সাদা তিমিটির অনুপ্রেরণা ছিল বাস্তব জীবনের একটি ভয়ংকর সাদা স্পার্ম তিমি, যেটি ১৯শ শতকে তিমি শিকারীদের জন্য আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল। ছবি: সংগৃহীত
বিখ্যাত অ্যালবিনো মানুষ
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া শন রস সবচেয়ে পরিচিত অ্যালবিনো মডেলদের একজন। ছোটবেলায় তাকে স্কুলে কটূক্তি, বুলিং ও বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। সহপাঠীরা তার সাদা চুল, ফ্যাকাশে ত্বক ও চোখের চেহারা নিয়ে হাসাহাসি করত।
তিনিই পরে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় আলাদা পরিচয় তৈরি করেন। শুধু মডেলিং নয়, অভিনয় ও সংগীত ভিডিওতেও তিনি কাজ করেছেন। বিয়ন্সে ও কেটি পেরির মিউজিক ভিডিওতেও তাকে দেখা গেছে।
শন রস বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মানুষ যেন অ্যালবিনোদের ‘ভিনগ্রহের প্রাণী’ বা ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে না দেখে। তার মতে, মানুষের ভিন্ন চেহারা ভয় পাওয়ার কিছু নয়, বরং বৈচিত্র্যেরই অংশ।
হংকংয়ে জন্ম নেওয়া কনি চিউ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত প্রথম অ্যালবিনো ফ্যাশন মডেলদের একজন। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে তিনিই অ্যালবিনো ছিলেন।
শৈশবে তার পরিবার সুইডেনে চলে যায়। সেখানে বড় হওয়ার পর তিনি মডেলিংয়ের কাজ শুরু করেন। ১৯৯০ এর দশকে ইউরোপের ফ্যাশনে তার ফ্যাকাশে সাদা চেহারা, সোনালি চুল ও আলাদা উপস্থিতি দ্রুত সবার নজর কেড়েছিল।
কনি চিউ বলেছেন, ছোটবেলায় নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগতেন। পরে বুঝতে পারেন, তার এই আলাদা চেহারাই তাকে অনন্য করেছে।
অ্যালবিনিজম কোনো ‘রোগ’ নয়, এটি একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মানো মানুষ ও প্রাণীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহানুভূতি ও নিরাপত্তা।
তথ্যসূত্র:
National Geographic – Albino animals explained
Scientific American – What causes albinism?
Under the Same Sun
NOAH (National Organization for Albinism and Hypopigmentation)
Euronews – Albino buffalo in Bangladesh