যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি শক্তি প্রদর্শন: কোথায় দাঁড়িয়ে মার্কিন নৌবাহিনী
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছে। এই যুদ্ধে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং ১৫৫টিরও বেশি নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে।
‘ইউএসএনআই নিউজ ফ্লিট অ্যান্ড মেরিন ট্র্যাকার: ৬ এপ্রিল, ২০২৬’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে মার্কিন নৌবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়।
এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতির পটভূমিতে মার্কিন নৌবাহিনী বিশ্বজুড়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে নতুন চ্যালেঞ্জ ও প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে শক্তির উপস্থিতি
চলতি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর শক্ত উপস্থিতি দেখা গেছে। জাপানে ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’, প্রশান্ত মহাসাগরে ‘বক্সার এআরজি’, ক্যারিবিয়ান সাগরে ‘ইয়োজিমা এআরজি’, আটলান্টিক মহাসাগরে ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মোতায়েন রয়েছে।
এগুলো থেকে বোঝা যায়, বিশ্বজুড়ে দ্রুত মোতায়েন ও কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে তারা।
তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আরব সাগর এবং সেখানে চলা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
এখানে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ৩-এর নেতৃত্বে এখনো রয়েছে নিমিৎজ-ক্লাস এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এই রণতরি থেকে নিয়মিত সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে অভিযানে অংশ নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য
যুদ্ধবিরতির পরও আরব সাগরে আব্রাহাম লিংকনের সামরিক উপস্থিতি ও ‘এপিক ফিউরি’ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে দ্রুত ও শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
তাদের দাবি, এই ধরনের মোতায়েনের মূল লক্ষ্য মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে সতর্ক বার্তা দেওয়া।
ইউনিটের পরিচয় ও ঐতিহ্য
মার্কিন নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্কোয়াড্রনের শুধু কোড নামই নয়, আলাদা ডাকনামও রয়েছে। এসব নাম তাদের কাজের ধরন, দায়িত্ব ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
ভিজিল্যান্টস (সতর্ক প্রহরী): এই নামটি শত্রুর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং যেকোনো সময় আঘাত হানার প্রস্তুতির প্রতীক।
গ্রে উলভস (ধূসর নেকড়ে): দলবদ্ধভাবে আক্রমণ এবং শত্রুর রাডার ও সিগন্যাল নষ্ট করার কৌশল বোঝায় এই নামটি।
সান কিংস (সূর্য রাজারা): আকাশে থাকা আগাম সতর্কতা ও রাডার বিমানগুলো পুরো যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করে ও তথ্য সরবরাহ করে। এটি তারই প্রতীক।
মাইটি বাইসন (শক্তিশালী বাইসন): রসদ ও সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত বিমানগুলোর শক্তি ও সহনশীলতাকে এই নামে বোঝানো হয়।
প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
ভবিষ্যতের নৌযুদ্ধে টিকে থাকতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। মার্কিন মেরিন কোর প্রথমবারের মতো একটি কাস্টম ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রে ভাসমান লক্ষ্যে সফলভাবে সরাসরি হামলা চালিয়েছে।
এই পরীক্ষা দেখায়, ভবিষ্যতের যুদ্ধ ধীরে ধীরে মনুষ্যবিহীন প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে। এতে সমুদ্রে নজরদারি ও নির্ভুল হামলা আরও সহজ হবে।
এ ছাড়া, দূরপাল্লার আক্রমণ ও আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে পেন্টাগন ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ৩ বিলিয়ন ডলার ও এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বড় শক্তিগুলোর সংঘাতে দূর থেকে নির্ভুল আঘাত ও শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সক্ষমতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঐতিহাসিক পালাবদল
একদিকে যখন নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক অস্ত্র নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো যুগের প্রতীকগুলো বিদায় নিচ্ছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম পরিচিত এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস নিমিতজ দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর শেষ যাত্রায় রয়েছে। পানামা হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা প্রদক্ষিণ করছে জাহাজটি।
এর কার্যকাল ২০২৭ সাল পর্যন্ত কিছুটা বাড়ানো হলেও এরপর ভার্জিনিয়ায় একে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে পাঠানো হবে।