চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়া নিয়ে যত বিতর্ক
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দেশের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক টার্মিনাল, যা মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় অর্ধেক সামলায়।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করায় শ্রমিক, কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ আন্দোলনে নেমেছেন।
প্রশ্ন উঠেছে—ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়া নিয়ে এত আপত্তি কেন এবং প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী বিতর্ক রয়েছে?
ডিপি ওয়ার্ল্ড কী?
ডিপি ওয়ার্ল্ড বা দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ড একটি বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনা ও লজিস্টিকস কোম্পানি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি দুবাই সরকারের মালিকানাধীন দুবাই ওয়ার্ল্ডের অধীন।
ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের ৮৩টি দেশে বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে ৪০টিরও বেশি বন্দর পরিচালনা করছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বছরে প্রায় ৭০ মিলিয়ন কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বের মোট কন্টেইনার ট্রেডের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
এর গ্রুপ চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম। তিনি দুবাইয়ের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যিনি দুবাইয়ের পোর্টস, কাস্টমস এবং ফ্রি জোন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানও।
এপস্টিন নথি নিয়ে বিতর্ক
জেফরি এপস্টিন একজন মার্কিন বিনিয়োগকারী, যিনি যৌন নিপীড়নের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে জেলে মারা যান।
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত এপস্টিন-সম্পর্কিত বিপুল সংখ্যক নথিতে দেখা যায়, তার সঙ্গে সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যোগাযোগ ছিল।
কিছু ক্ষেত্রে এপস্টিন বিন সুলায়েমকে ইমেইলে বিনিয়োগ ও আর্থিক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যের টেমস নদীর তীরে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের একটি বন্দর প্রকল্পে সহায়তা করেছিলেন।
ওই প্রকল্পে সরকারি সমর্থন পেতে ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগেও তিনি ভূমিকা রাখেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
নথিগুলোতে আরও দেখা যায়, ইমেইলে এপস্টিন এবং বিন সুলায়েম লিবিয়ার সম্পদ উদ্ধার, ইসরায়েল-মঙ্গোলিয়া নিরাপত্তা চুক্তি, সৌদি আরবের ২০১৭ সালের করাপশন পার্জ (যাতে রয়্যাল ফ্যামিলির সদস্যরা জড়িত) এবং এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাতার আক্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এপস্টিন এমনকি বিন সুলায়েমকে আর্থিক উপদেশ দিয়েছেন, যেমন লন্ডনের ডিউকস হোটেলের পুনঃঅর্থায়নে সাহায্য করা। এছাড়া, ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সাথে বিন সুলায়েমের বৈঠকের আয়োজন করেছেন।
কিছু ইমেইলে বিন সুলায়েম কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে কথা বলেছেন, কিন্তু পরে এমন কথাও বলেছেন যা যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
নথিগুলো থেকে বোঝা যায়, এপস্টিন কখনও কখনও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের লোক হিসেবে কাজ করেছেন। যেমন সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে তদবিরে যুক্ত ছিলেন, যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বারবেরা বন্দর বিষয়টি জড়িত ছিল।
এ কারণে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, তার সঙ্গে কিছু গোয়েন্দা সংস্থার (যেমন এমআইসিক্স বা মোসাদ) যোগাযোগ থাকতে পারে।
যদিও বিন সুলায়েমের বিরুদ্ধে কোনো যৌন অপরাধের অভিযোগ নেই, তবু এপস্টিনের মতো দণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভাবমূর্তিতেও কিছু প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিতর্ক
আফ্রিকার জিবুতিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ডোরালেহ কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে বিরোধের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৬টি প্রধান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে মার্কিন কংগ্রেস তাতে বাধা দেয়। চুক্তির শর্ত ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে জিবুতি সরকার চুক্তি বাতিল করে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে গড়ায়।
অন্যদিকে, ২০০৬ সালে একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বন্দর পরিচালনার সুযোগ এলেও জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তখন যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সেই সুযোগ দেয়নি।
এসব উদাহরণ দেখিয়ে সমালোচকেরা বলছেন, কৌশলগত অবকাঠামোতে বিদেশি অপারেটর নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এনসিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এই টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজ ও একটি অভ্যন্তরীণ নৌপথের ছোট জাহাজ ভেড়ানো যায়। এনসিটিতে জাহাজ থেকে বার্ষিক ১০ লাখ ইউনিট কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ক্ষমতা রয়েছে।
দেশীয় প্রতিষ্ঠান দরপত্রের মাধ্যমে গত ১৭ বছর ধরে এনসিটি টার্মিনালটি পরিচালনা করছে। এখন এটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। দেশের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালেই হয়।
আন্দোলনকারীদের মতে, দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই এই টার্মিনালের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
আন্দোলনের কারণ
শ্রমিক ও কর্মচারীদের সংগঠনগুলো মিলে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেছে। তাদের প্রধান যুক্তি হলো, এনসিটি একটি কৌশলগত সম্পদ। এটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, বিশেষ করে টার্মিনালের কাছেই নৌবাহিনীর বড় ঘাঁটি থাকায়।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, ইজারা হলে সেবামূল্য বাড়তে পারে। ফলে রপ্তানি খরচ, বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতের ব্যয় বাড়বে। শ্রমিকরা চাকরি হারানোর শঙ্কা ও কর্মপরিবেশ খারাপ হওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
প্রতিবাদকারীরা ইজারা প্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ বলে অভিযোগ তুলেছেন এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন। টানা কর্মবিরতি ও ধর্মঘটে কনটেইনার ওঠানামা, আমদানি-রপ্তানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান
অন্তবর্তী সরকার বলছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড এলে নতুন বিনিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা আসবে। এতে বন্দরের সক্ষমতা ও আয় বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বমানের বন্দরে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
তবে বন্দর ব্যবহারকারীদের একটি অংশ মনে করেন, বন্দরের দক্ষতা নির্ভর করে নাব্যতা, কাস্টমস সক্ষমতা, দ্রুত কনটেইনার খালাসসহ নানা কাঠামোগত বিষয়ের ওপর। শুধু একটি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দিলেই এসব সমস্যার সমাধান হবে না।