বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নারীদের কর্মজীবন নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের মনোভাবই আছে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এটি তার দলের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও তার বক্তব্যে বিষয়টা বারবার উঠে এসেছে।
জামায়াতে আমিরের প্রস্তাব অনুসারে, নারীদের (বিশেষ করে মায়েদের) কর্মঘণ্টা আট থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টায় আনা হবে, কিন্তু বেতন থাকবে পুরো আট ঘণ্টার সমান। এখানে নিয়োগকর্তা পাঁচ ঘণ্টার বেতন দেবেন এবং বাকি অংশ সরকার দেবে।
এই প্রস্তাবের ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনার আগে বলা দরকার যে আট ঘণ্টা কর্ম দিবসের আন্তর্জাতিক নীতিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর এই প্রস্তাবকে অনেকে নারীদের সুরক্ষা এবং পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকার প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখছেন। তবে অন্যরা এটিকে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের প্রতিফলন বলে সমালোচনা করেছেন, যা নারীদের কর্মক্ষেত্র সীমিত করতে ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে নারীরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। তাদের বড় অংশই গার্মেন্টস, কৃষি এবং অন্যান্য শ্রমঘন খাতে অবদান রাখছেন। ওভারটাইম (বাড়তি কর্মঘণ্টা) করে তারা পরিবার এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর পরিকল্পনার অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার।
বাংলাদেশে নারীদের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক ভূমিকা
বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং নারীরা এর অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, দেশের কর্মক্ষম নারীদের (১৫ বছরের বেশি) মধ্যে লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট (এলএফপিআর) ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮০ দশমিক ৯ শতাংশ।
এর মানে হলো, কর্মক্ষম নারীদের অর্ধেকেরও কম অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়। তবে এই সংখ্যাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে। ১৯৯০ সালে এটি ছিল মাত্র ২৪ শতাংশ।
গার্মেন্টস খাতে নারীদের অবদান এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুসারে, বর্তমানে শুধু তৈরি পোশাক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি। মজুরির হার কম হওয়ার কারণে এই নারীরা বাড়তি উপার্জনের আশায় প্রায়ই ওভারটাইম করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের জরিপ অনুসারে, কর্মরত নারীদের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যা গৃহস্থালীতে বা মৌসুম-নির্ভর এবং কম মজুরির।
এছাড়া, গ্রামীণ এলাকায় নারীদের এলএফপিআর ৫১ শতাংশ (২০২২ সালে), যা শহুরে এলাকার চেয়ে বেশি।
এই নারীরা কৃষি, গৃহকর্ম এবং ছোট ছোট শিল্পে যুক্ত। অর্থনৈতিকভাবে নারীদের এই অবদান দেশের জিডিপিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, নারীদের লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন বাড়লে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দুই থেকে তিন শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু সামাজিক রীতি (যেমন পিতৃতান্ত্রিকতা) এখনও নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসতে বাধা দেয়।
বিবিএসের ২০২৩ সালের তথ্যে দেখা যায়, নারীদের ৩৭ শতাংশ গৃহস্থালীতে কাজ করেন, যা পুরুষদের চেয়ে ১৪ শতাংশেরও বেশি।
এ ছাড়া, নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিট বিনা মজুরিতে পরিবারের যত্ন ও ঘরের কাজ করেন, যা পুরুষদের ১ ঘণ্টা ২৩ মিনিটের চেয়ে তিনগুণ বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, এই কাজগুলো আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করলে জিডিপির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের সমান হতে পারে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব
জামায়াতে ইসলামীর এই প্রস্তাবের প্রভাব ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের প্রেক্ষাপটে।
প্রথমত, যদি সরকার পুরোপুরি বেতন না দিতে পারে (বাজেটের অভাবে), তাহলে নারীদের উপার্জন কমবে। বাংলাদেশে নারীরা ইতোমধ্যে পুরুষদের চেয়ে কম বেতন পান (জেন্ডার পে গ্যাপ ২০-৩০ শতাংশ) এবং ওভারটাইম তাদের অতিরিক্ত আয়ের উৎস।
কর্মঘণ্টা কমলে পরিবারের আয় কমবে, যা দারিদ্র্য বাড়াতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৮ সালের একটি অনুমান বলছে, ২৫-৩৪ বছরের নারীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার পুরুষদের চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি।
দ্বিতীয়ত, এটি লৈঙ্গিক বৈষম্যকে শক্তিশালী করবে। নারীদের শুধু মায়ের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাদের কর্মজীবনের উন্নয়ন আরও কমতে থাকবে।
তৃতীয়ত, নিয়োগকর্তাদের ওপর চাপ পড়বে। গার্মেন্টসের মতো খাতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকে। জামায়াতের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পাঁচ ঘণ্টার পর নতুন শিফট লাগবে, যা জটিলতা বাড়াবে। এই জটিলতা এড়াতে নিয়োগকর্তারা নারীদের কম নিয়োগ দিতে আগ্রহী হবেন। এর নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগ কমতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর এই প্রস্তাব জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধরে নেওয়া যায়।
অন্য দেশের উদাহরণ এবং ফলাফল
সারা বিশ্বে লৈঙ্গিক পার্থক্যের কারণে কর্মঘণ্টা কমানোর উদাহরণ কম। কারণ এটি বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হয়।
তবে নমনীয় কর্মব্যবস্থা (ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কিং অ্যারেঞ্জমেন্টস), যেমন—শর্টার উইক (সংক্ষিপ্ত সপ্তাহ) বা রিমোট ওয়ার্ক (কর্মস্থল থেকে দূরে বসে কাজ করা) অনেক দেশেই প্রচলিত আছে এবং এতে তারা ভালো ফলও পেয়েছে।
নেদারল্যান্ডস বিশ্বের সবচেয়ে কম গড় কর্ম সপ্তাহের দেশ—সপ্তাহে ২৯ ঘণ্টা।
আইসল্যান্ডে ২০২২ সাল থেকে ৫১ শতাংশ কর্মী চারদিনে সপ্তাহ নীতিতে কাজ করে। এরপরও উৎপাদন একই থেকেছে।
জাপানের টোকিওতে ২০২৫ থেকে সরকারি চাকুরেরা চারদিনের কর্ম সপ্তাহ কাটায়। ইউরোপের দেশ ফ্রান্স ও ডেনমার্কে সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৩৯ ঘণ্টা কাজ করাটা সাধারণ ব্যাপার।
তবে কোনো কোনো দেশে আইন করে বা রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর ইতিহাসও আছে, বিশেষ করে উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। এই ধরনের আইনগুলোর বেশিরভাগই ‘প্রোটেকটিভ লেজিসলেশন’ (সুরক্ষামূলক আইন) হিসেবে চালু হয়েছিল, যা নারীদের শারীরিক সুরক্ষা, মাতৃত্ব এবং পরিবারের যত্নের কথা মাথায় রেখে তৈরি।
আধুনিক সময়ে এই আইনগুলোকে লিঙ্গ বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা করা হয় এবং অনেক দেশে বাতিল বা সংশোধিত করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বা নবজাতকের যত্নের জন্য ছাড় দেওয়া তো আছেই, কিন্তু তার বাইরেও সরাসরি কর্মঘণ্টা কমানোর উদাহরণ আছে।
যুক্তরাজ্য ১৮৪৭ সালের ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট প্রণয়ন করে, যা ‘টেন আওয়ার্স অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত। সেখানে নারী এবং ১৮ বছরের নিচে শিশুদের জন্য টেক্সটাইল শিল্পে কর্মঘণ্টা ১০ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করা হয়। এটি শ্রমিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপের ফলে চালু হয়, যা নারীদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল। পরে ১৯৩৭ সালের ফ্যাক্টরিস অ্যাক্টে নারী এবং যুবকদের জন্য দৈনিক ৯ ঘণ্টা এবং সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা সীমা নির্ধারণ করা হয়।
ফ্রান্স ১৮৯২ সালে শিল্পে নারীদের নাইট ওয়ার্ক (রাত্রিকালীন কাজ) নিষিদ্ধ করে, যা পরোক্ষভাবে তাদের কর্মঘণ্টা কমায়। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে ২০০১ সালে বাতিল হয়, কারণ এটি বৈষম্যমূলক।
বুলগেরিয়া ১৯০৫ সালে একটি আইন করে নারীদের (১৬ বছরের উপরে) জন্য দৈনিক ১০ ঘণ্টা সীমা নির্ধারণ করা হয়। এটি বুলগেরিয়ান ওয়ার্কার্স সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নীতির অংশ ছিল।
১৯১৯ সালে আইএলও’র ‘কনভেনশন কনসার্নিং এমপ্লয়মেন্ট অব ওম্যান ডিউরিং দ্য নাইট (নাইট ওয়ার্ক কনভেনশন)’ চালু হয়, যা নারীদের রাতে কাজ করাকে নিষিদ্ধ করে এবং কর্মঘণ্টা সীমিত করে। এটি ১৯৩৪ এবং ১৯৪৮ সালে সংশোধিত হলেও পরে বৈষম্যমূলক বলে সমালোচিত হয়।
ভারতে ফ্যাক্টরি অ্যাক্টে নারীদের জন্য নাইট শিফট ব্যান এবং সীমিত ঘণ্টা (দৈনিক ৯ ঘণ্টা) আছে, যা ঔপনিবেশিক যুগ থেকে চলে আসছে।
ইতিহাসে এই আইনগুলো নারীদের ‘সুরক্ষা’র নামে চালু হয়, কিন্তু এতে লিঙ্গ বৈষম্য শক্তিশালী হয়। আধুনিক সময়ে আইএলও এবং ইইউ-এর মতো সংস্থা এগুলোকে বাতিল করে জেন্ডার-নিরপেক্ষ নীতির (যেমন-প্যারেন্টাল লিভ বা ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক) প্রচলন করেছে।