হবিগঞ্জের সুতাং নদীর মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

হবিগঞ্জের সুতাং নদীর পানি ও মাছের দেহে আশঙ্কাজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হকৃবি) এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। 

গবেষকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নদীটির জলজ পরিবেশ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।

ছবি: স্টার।

সম্প্রতি প্রকাশিত এই গবেষণার জন্য নদী থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করা হয়। এতে মোট ৫১টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। 

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মাছে গড়ে ১ দশমিক ৭টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বড় আকারের মাছগুলো দীর্ঘ সময় দূষিত পরিবেশে থাকায় সেগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।

ছবি: স্টার।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সুতাং নদীর প্রতি লিটার পানিতে ৬ দশমিক ৬৭ থেকে সর্বোচ্চ ৪৬ দশমিক ৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। এসব কণার গড় আকার শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার। 

ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিথিন (পিই), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) ও পলিআমাইডের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে, যা মূলত প্যাকেজিং ও বস্ত্রশিল্পের বর্জ্য থেকে আসে।

গবেষক মো. শাকির আহম্মদ বলেন, মিঠাপানির এই দূষণ দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

স্থানীয় ভাদগরি গ্রামের বাসিন্দা শফিক মিয়া তার দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলেন, নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে যাওয়ায় আমরা বিপদে আছি। পানির সংস্পর্শে এলেই শরীরে চুলকানি শুরু হয়।

সাধুর বাজার এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গুলনাহার বেগম জানান, নদীর তীব্র দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা ও স্কুলে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ নদী কমিশনের তালিকাভুক্ত (নম্বর ১২০৬) এই আন্তঃসীমান্ত নদীটি ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একসময় এই নদী হাওর অঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম থাকলেও এখন শিল্পবর্জ্যে নদীটি মৃতপ্রায়। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অনেক শিল্পকারখানা বর্জ্য পরিশোধন না করেই সরাসরি নদীতে ফেলছে।

নদী তীরবর্তী করাব, ছড়িপুর, উচাইল, রাজিউড়া, সাধুরবাজার, মির্জাপুর, ঘোড়াইল চর ও রহিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর পানি কালো হয়ে গেছে ও তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দূষিত পানিতে বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভাসিটির উপাচার্য অধ্যাপক জহিরুল হক শাকিল বলেন, অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে এ অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সুতাং নদী এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নদীর পানি কালো আলকাতরার মতো প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিল্পকারখানার সব ধরনের বর্জ্য উৎসে পরিশোধন বাধ্যতামূলক হলেও এ অঞ্চলের অনেক কারখানায় তা মানা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, সুতাং নদী ও আশপাশের খাল-বিলের চিত্র দেখলেই বোঝা যায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন উন্নয়নের বদলে পরিবেশ ধ্বংস ডেকে আনছে। নদী ও জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য নিক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সায়েম উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সুতাং নদীর পানি ও মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই গবেষণা পরিবেশ সুরক্ষা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) সদস্য সচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, শিল্পবর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে হবিগঞ্জের নদ-নদীগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।