গ্যাস সংকটে বেড়েছে ভোগান্তি ও খরচ
রাজধানী ঢাকায় হাজারো পরিবারের জন্য এখন নতুন ভোগান্তি রান্না করা। পাইপলাইনের গ্যাসের চুলা জ্বলছে নিভু নিভু। অন্যদিকে বেড়েছে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট।
ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউ মার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলী, খিলগাঁওসহ আশেপাশের এলাকায় দিনের পর দিন পাইপলাইনের গ্যাসের স্বল্পচাপ। কোথাও কোথাও একেবারেই জ্বলছে না চুলা। ফলে অনেক পরিবার ইলেকট্রিক চুলা, উচ্চমূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বাইরে থেকে কেনা খাবারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অধিকাংশ গ্রাহক জানিয়েছেন, পাইপলাইনে তারা দিনে মাত্র এক-দুই ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়, তাও গভীর রাত কিংবা ভোরের দিকে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মীর হুজাইফা আল মামদূহ জানান, গত মঙ্গলবার থেকে গ্যাসের সরবরাহ একেবারেই নেই।
তিনি বলেন, 'গ্যাস লাইনে পানি আসায় শনিবার রাতে একজন টেকনিশিয়ান পাইপলাইন কাজ করে গেছেন। পরদিন সকালে কিছু সময় চুলা জ্বললেও, এরপর আবার গ্যাস চলে যায়। ফলে রান্না করা সম্ভব হয়নি।'
পরিবারটি রাইস কুকার ব্যবহার করে কেবল এক বেলা রান্না করতে পেরেছে, জানান মামদূহ। আরও বলেন, 'এলপিজি সিলিন্ডার এখন দুষ্প্রাপ্য, দামও বেশি। প্রায় প্রতিদিনই বাইরে থেকে নাশতা ও রাতের খাবার কিনতে হচ্ছে। সেখানেও ভোগান্তি। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি। অফিসের আগে কিংবা সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে রাতে বাড়ি ফেরার সময় লাইনে দাঁড়ানো কষ্টকর। এর জন্য সময় বের করাও কঠিন।'
কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা তামিম হাসান জানান, ২০১৮ সাল থেকে তিনি এই এলাকায় থাকেন। কিন্তু এমন তীব্র সংকটে মুখে এবারই প্রথম পড়লেন।
'এমনও হয়েছে যে আধা সেদ্ধ ভাত ফেলে দিতে হয়েছে,' বলেন তিনি। আরও জানান, ভোরবেলা কেবল এক-দুই ঘণ্টা গ্যাস থাকছে, তবে চাপ কম।
পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দা ফাহিম রেজা শোভন বলেন, ৭ জানুয়ারি রাত থেকে পাইপলাইনে গ্যাস নেই, চুলা একেবারেই বন্ধ। ৮ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে কিছু সময়ের জন্য চুলা নিভু নিভু জ্বলেছে। পরদিন সকালেও একই অবস্থা ছিল। শনিবার সকাল থেকে সেটুকুও নেই।
শোভনের স্ত্রী তাকে ইলেকট্রিক চুলা কিনে দিতে বলেছেন।
'গত কয়েক দিন মানসিকভাবে খুবই চাপ যাচ্ছে। সীমিত বেতনের বেশিরভাগই বাড়ি ভাড়া ও নিত্য দিনের খরচে ব্যয় হয়। এর মধ্যে ইলেকট্রিক চুলা কিনলে মাস চলতে হিমশিম খেতে হবে,' বলেন তিনি।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সাদিকুন নাহার দিলরুবার পরিবার এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। তাদের সিলিন্ডারের গ্যাস প্রায় শেষের দিকে। ফলে বাড়তি দামের জন্য তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বর্তমানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায়, যা সরকার নির্ধারিত মূল্য এক হাজার ৩৫০ টাকার প্রায় দ্বিগুণ।
দিলরুবা জানান, গতকাল থেকে তার শাশুড়ির বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। পাইপলাইনে সাধারণত ভোররাতে কিছু সময় গ্যাস আসে এবং সকাল ৭টার আগেই চলে যায়। কিন্তু এখন সেটুকুও পাওয়া যাচ্ছে না।
'এখন সব রান্না ইলেকট্রিক চুলায় করতে হচ্ছে। নাশতা প্রায়ই বাইরে থেকে আনতে হয়। গ্যাসের চুলা পুরোপুরি বন্ধ।'
মগবাজারের বাসিন্দা রাফসান জানির বাসার কেয়ারটেকার গত তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও তাদের ৪৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল করতে পারেননি।
সিলিন্ডারে যে সামান্য গ্যাস অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে সারাদিনের রান্না একবেলায় সারতে হচ্ছে তাদের।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তুরাগ নদীর নিচে একটি প্রধান পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং শেরেবাংলা নগর এলাকায় একটি ভালভ ফেটে যাওয়ায় চলমান এই সংকট তীব্র হয়েছে। ব্যাহত হয়েছে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, অতীতের তুলনায় দৈনিক গড় গ্যাস সরবরাহ ধাপে ধাপে কমেছে। ২০২২ সালে ১ থেকে ১০ জানুয়ারির মধ্যে যেখানে গড় সরবরাহ ছিল দৈনিক দুই হাজার ৮২৬ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), চলতি বছরে তা কমে দুই হাজার ৫৯৬ এমএমসিএফডিতে দাঁড়িয়েছে।
এই সরবরাহ ২০২৪ সালের জানুয়ারির সরবরাহের কাছাকাছি। গত বছর এই ১০ দিনে গড় সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৬৫৭ এমএমসিএফডি।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে হয় এমন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় মোট সরবরাহ সীমিতই থেকে গেছে। ফলে গৃহস্থালি পর্যায়ে পাইপলাইনের গ্যাস বিতরণ সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে একমত নন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তার দাবি, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে।
ফাওজুল কবিরের ভাষ্য, ২০২৫ সালে সরকার মোট ১০৯ কার্গো এলএনজি আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯৪টি বেশি। ফলে দেশীয় উৎপাদনে ঘাটতি থাকলেও গ্যাস সরবরাহ কমেনি।
চলমান সংকটের জন্য তিনি কেবলই পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত ও ভালভজনিত সমস্যাকে দায়ী করেছেন।
এলপিজির অস্থির পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ৯৮ শতাংশ এলপিজি বেসরকারি খাত আমদানি করে। সরকার নিজ উদ্যোগে গ্যাস আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করছে।
'গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবে,' যোগ করেন তিনি।