জ্বালানি তেল বিক্রিতে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের বণ্টন নিশ্চিত করতে এবং মজুতদারি ঠেকাতে ডিজিটাল সরবরাহব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আওতায় কিউআর কোড বা কার্ডভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত এই মডেলে ব্যক্তি বা যানবাহনের বিপরীতে জ্বালানি কেনার তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে কে, কোথা থেকে, কী পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, তা নজরদারি করা যাবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘পদ্ধতিটি কেমন হবে, তার রূপরেখা তৈরি করতে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন এর কাজ চলছে।’
বিপিসি চেয়ারম্যান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কিছু গ্রাহক বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন থেকে বারবার তেল সংগ্রহ করছেন, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। এই সমস্যার সমাধানেই মূলত এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আমদানিতে বিলম্ব এবং দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে জ্বালানি বিতরণে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতেই সরকার এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। পদ্ধতিটি চূড়ান্ত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে ১৯টি ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বেশির ভাগ পাম্পেই সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। প্রতিদিন পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে এবং তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় চলতি মাসের শুরুতে অস্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল সরকার। পরে এই ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন নিজেদের মতো করে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে নিয়েছে, যেন কোনো গ্রাহককে ফিরে যেতে না হয়। মালিবাগ মোড়ের রাজারবাগ সার্ভিস স্টেশন ও মৎস্য ভবনের কাছের রমনা পেট্রলপাম্পে গিয়ে দেখা যায়, তারা মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার এবং প্রাইভেট কারে দেড় থেকে ২ হাজার টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না।
রমনা পেট্রলপাম্পের মালিক ও বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, অনেক গ্রাহক দিনে কয়েকবার করে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, তারা রেশনিং চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে আগের মতো মোটরসাইকেলে দুই লিটার ও গাড়িতে ১০ লিটার করে দেওয়ার নিয়মটি কাজে আসবে না বলে মনে করেন তারা। এর বদলে স্থানীয় থানার ইস্যু করা কার্ডের মাধ্যমে রেশনিং চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তবে সরকার আর রেশনিং ব্যবস্থায় ফিরবে না বলে জানিয়েছেন বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার পক্ষে তিনি।
রেজানুর রহমান বলেন, ‘এটি এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা হবে, যা সুষম বণ্টন নিশ্চিত করবে। যাতে সবাই পর্যাপ্ত জ্বালানি পান এবং মজুতদারি বন্ধ হয়।’
সেচের জন্য কৃষকদের জ্বালানির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ পদ্ধতি তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে তারা অনায়াসেই তেল কিনতে পারবেন।
তিনি জানান, প্রস্তাবটি এখনো পর্যালোচনাধীন, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, তবে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
এদিকে সরকারের তরফে গতকাল আবারও আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে যে দেশে জ্বালানির মজুত পর্যাপ্ত। মূলত আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনা (প্যানিক বায়িং) এবং অনিয়ন্ত্রিত বিতরণের কারণেই খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
জ্বালানি মজুতদারির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান জোরদার করেছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ ডিপোগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং পেট্রলপাম্পগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সার্বিক তদারকি বাড়াতে দেশজুড়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বিপিসির কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালন করবেন। আর জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেবেন। এসব কর্মকর্তা জ্বালানি ব্যবস্থাপনার তদারকি করবেন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দৈনিক প্রতিবেদন জমা দেবেন।
এ ছাড়া বিপিসি ডিপো থেকে জ্বালানি বিতরণের সময় দুই ঘণ্টা এগিয়ে এনেছে। ডিলারেরা এখন আগের সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার বদলে সকাল ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন। ফিলিং স্টেশনগুলো যাতে আরও আগে তেল পায়, সে জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর মহাখালী, মালিবাগ, রমনা ও পরিবাগ এলাকার অন্তত ১২টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ পাম্পই তেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দিয়েছে। প্রতিটি পাম্পেই মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন ছিল।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গতকাল আসাদগেট থেকে গাবতলী পর্যন্ত সাতটি ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করে সরকারের একটি মনিটরিং দল। তারা দেখতে পায়, অনেক গ্রাহক, বিশেষ করে মোটরসাইকেলচালকেরা বারবার তেল নিচ্ছেন। এতে অকটেনের চাহিদা প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে।
জ্বালানিসংকটের প্রভাব পড়েছে বান্দরবান, মৌলভীবাজার, শরীয়তপুর ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বান্দরবানের উজমা অয়েল ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার পেট্রল ও অকটেন দেওয়া হলেও একপর্যায়ে অকটেন শেষ হয়ে যায়। বিভিন্ন পাম্পে ডিজেলও সীমিত আকারে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মৌলভীবাজারেও অনেক ফিলিং স্টেশনে পেট্রল ও অকটেনের মজুত ফুরিয়ে গেছে। সেখানে কর্মীরা অলস সময় পার করছেন, আর চালকেরা তেলের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। শরীয়তপুরে টানা দুদিন ধরে বেশির ভাগ পাম্প বন্ধ। ডিজেলের সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পদ্মাপাড়ের জেলেরা। তারা দৈনিক চাহিদার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ তেল পাচ্ছেন। নরসিংদীতেও তিন-চার দিন পরপর একবার পেট্রল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং ডিজেল দেওয়া হচ্ছে একেবারে সীমিত পরিমাণে।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বান্দরবান, মৌলভীবাজার, শরীয়তপুর ও নরসিংদীর নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)