ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে তিন দিনে বিলীন ১৫০ বসতভিটা

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় দেড় শ বসতভিটা। নদের গর্ভে চলে গেছে কয়েক শ বিঘা আবাদি জমি, ফলের বাগান ও বিদ্যুতের খুঁটি। চোখের সামনে বসতবাড়ি ভেঙে যেতে দেখছেন কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষ। 

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম আজ বুধবার সকালে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, গত রোববার সকাল থেকে গতকাল মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিলমারী ইউনিয়নের চর কড়াইবরিশাল, চর শাখাহাতী, বিশারপাড়া ও চর মনতলা এলাকা। মাথাগোঁজার ঠাঁই হারিয়ে অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে কিংবা খাসজমিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

নদীর মাঝখানে অবস্থিত চিলমারী ইউনিয়নের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। ইউপি চেয়ারম্যান জানান, রোববার সকালে হঠাৎ করেই ভাঙন শুরু হয়। প্রথম এক ঘণ্টাতেই নদীগর্ভে চলে যায় ২৫টি বসতভিটা। এরপর প্রতিদিনই ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তিন দিনে ১৫০ বসতভিটা নদের পেটে বিলীন হয়েছে। আজ সকালে বসতভিটা না ভাঙলেও ৫০-৬০ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, তাতে পুরো চিলমারী ইউনিয়নই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিস, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ সবকিছুই এখন হুমকির মুখে।’

চর কড়াইবরিশালের কৃষক লাল মিয়া (৬০) বলেন, ‘রোববার দুপুরে চোখের সামনে বসতভিটা আর সাত বিঘা জমি নদীতে চলে গেল। কোনোরকমে তিনটা টিনের ঘর খুলে অন্যের জমিতে রেখেছি। ৩০ বছর আগে এই চরে বসতি গড়েছিলাম। এখন আমি ভূমিহীন। সামনে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, চিলমারী ইউনিয়নের চারটি চরে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে চর কড়াইবরিশালেই বাস প্রায় ২ হাজার ৭০০ পরিবারের। এখানেই রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিস, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ১০টি বিদ্যুতের খুঁটি। এতে প্রায় ৪০০ পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাত্র দেড় হাজার জিও ব্যাগ দিয়েছে। কিন্তু এত ভয়াবহ ভাঙনের সামনে তা কোনো কাজেই আসছে না। তিনি বলেন, ‘এখানে অন্তত এক লাখ জিও ব্যাগ প্রয়োজন। পাউবো ও স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘চিলমারী ইউনিয়ন ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝখানে অবস্থিত। চরাঞ্চলে দীর্ঘ এলাকাজুড়ে স্থায়ী নদীশাসন অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। প্রাথমিকভাবে দেড় হাজার জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় এটা খুবই কম। আপাতত এগুলো শুধু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ 

তিনি আরও বলেন, নদীর মাঝখানে চরে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি খাসজমিতে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।