ঈদের সেই অ্যালবামের দিনগুলো যেমন ছিল

নব্বই দশকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ঈদ মানে শুধু নতুন জামা, সেমাই আর ঘোরাঘুরি ছিল না। ঈদ মানে ছিল নতুন অ্যালবামের পসরা। ঠিক ঈদের আগের দিন বা আগের সপ্তাহে ক্যাসেটের দোকানগুলোতে যে হঠাৎ ভিড় জমে যেত, সেই ভিড়ের ভেতরেই যেন লুকিয়ে থাকত এক ধরনের উৎসবের প্রতীক্ষা। হাতে নতুন ক্যাসেট, ভেতরে একসঙ্গে তিন চারজন শিল্পীর গান।

গান ছাপিয়েও এগুলো ছিল এক সময়ের আবেগ ও সামাজিক রুটিন। রেডিওতে বাজত, টেলিভিশনে আসত, পাড়ার দোকানের সাউন্ডবক্সে ভেসে যেত, বাসে-রিকশায় ছড়িয়ে পড়ত এই গানগুলো, যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে যেত অনায়াসে। এই পুরো সাংস্কৃতিক প্রবাহের কেন্দ্রে ছিলেন—আশিকুজ্জামান টুলু, প্রিন্স মাহমুদ, জুয়েল বাবু ও শওকাত। গানের সঙ্গে তারা তৈরি করেছিলেন একটি যুগ, যেখানে ঈদ আর সংগীত একে অপরের সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

আশিকুজ্জামান টুলুর ‘স্টারস’ অ্যালবাম দিয়েই শুরু করা যাক। ‘হেসে খেলে এই মনটা আমার’, ‘সময় এসেছে’, ‘কোন এক সুন্দরী রাতে’—এই গানগুলো একসময় এতোটাই পরিচিত ছিল যে, এগুলো আলাদা করে পরিচিতি দাবি করত না। ‘আলোড়ন’ অ্যালবামের ‘কোনো অভিযোগ’ গানে ছিল এক অন্য ধরণের আবহ, যেখানে সুর আর কথার ভেতরে একধরনের নরম বিষণ্ণতা ও দুর্দান্ত ছন্দ একসঙ্গে কাজ করেছিল। এরপর ‘স্টারস-২’ এসে সেই ধারাকে আরও মজবুত করে—‘একটু পরে নামবে সন্ধ্যা’, ‘সারারাত তুমি’, ‘ভুলে গেছি কবে’, এই প্রতিটি গান যেন সময়ের দৈনন্দিন অনুভূতিকে ধরে রাখত। ‘আনন্দধারা’ অ্যালবামের ‘সেই সে বালুকাবেলায়’ গানটিও শ্রোতাদের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।

tulu
আশিকুজ্জামান টুলু। ছবি: সংগৃহীত

তবে এই পুরো যুগের সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে প্রিন্স মাহমুদ। তিনি একটি সাউন্ড-ইকোসিস্টেমও তৈরি করা করেছিলেন। ‘শক্তি’ অ্যালবামের ‘পালাতে চাই’ গান দিয়ে তার যাত্রা শুরু। আর তারপর তা থেমে থাকেনি। ‘ক্ষমা’ অ্যালবামের ‘ক্ষমা’ গানটা ছিল এক গভীর আত্মসংলাপ। এরপর ‘এখনো দু চোখে বন্যা’ অ্যালবামে একসঙ্গে আসে ‘কোনো কারণেই’, ‘মা’, ‘প্রশ্ন’, ‘কতদিন দেখেনি দু চোখ’ গানগুলো। এই গানগুলো আবেগের এক জটিল বহুমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেছিল।

‘শেষ দেখা’ অ্যালবামের ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’ গানটি এক ধরনের ব্যক্তিগত ভাঙনের গল্প বলে। ‘স্রোত’ অ্যালবামে ‘কাল আপন আজ পর’, ‘এক গল্প বলি’, ‘দুঃখস্রোতে’, ‘অভিমান নিয়ে’—সব গান মিলিয়ে যেন এক অনবরত প্রবহমান বিষণ্ণতা তৈরি হয়। ‘দাগ থেকে যায়’ অ্যালবামে ‘হয়নি যাবার বেলা’, ‘বেলা শেষে’, ‘জন্মদিন তোমার’, ‘আমি তো মরে যাবোর’ মতো গানগুলোর নামই যেন তাদের আবেগের ভার বহন করে।

‘দেয়াল: দুই হৃদয়ের মাঝে’ অ্যালবামের ‘কবিতার মতো সে চোখ’ এবং ‘পিয়ানো’ অ্যালবামের ‘বাংলাদেশ’ ও ‘তাজমহল’ গানগুলোয় প্রিন্স মাহমুদ ব্যক্তিগত আবেগকে যেমন সার্বজনীন করেছেন, তেমনি 'বাংলাদেশ' গানে জাতীয় অনুভূতির দিকেও গেছেন। ‘সা রে গা মা’ অ্যালবামের ‘চন্দ্রিমা’, ‘নীরবতা’ অ্যালবামের ‘আর কিছুক্ষণ কি রবে বন্ধু’ ও ‘অতশী’, ‘দেশে ভালোবাসা নাই’ অ্যালবামের ‘চলে যেতে যেতে’ ও ‘একা একা কি থাকা যায়’—এই গানগুলো তার সাউন্ড জগতকে আরও বিস্তৃত করে। ‘বারো মাস’ অ্যালবামের ‘বারো মাস তোমায় ভালোবাসি’ আজও শ্রোতাদের মুখে ফেরে।

এর বাইরে খালিদের কণ্ঠে তার সুরে ‘ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান’, ‘যতটা মেঘ হলে’, ‘যদি হিমালয় হয়ে’, এই গানগুলো বাংলা পপের ইতিহাসে এক বিশেষ জায়গা তৈরি করেছে। প্রিন্স মাহমুদ এক ধরনের আবেগ নির্মাতাও হয়ে উঠেছিলেন।

জুয়েল বাবু ছিলেন আরেক ধরনের সুরের জগত। সাব্বির আহমেদ জুয়েল আর আজমীর বাবু—এই দুইজন মিলে এমন এক জুটি তৈরি করেছিলেন, যাদের গান শুনলে মনে হতো হৃদয়ের গভীরে কোথাও বেদনার এক ধরনের নরম ছায়া নেমে এসেছে। ‘মেয়ে’ অ্যালবামের ‘মেয়ে’, ‘সরলতার প্রতিমা’, ‘একাকী প্রহর’—এই গানগুলো ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের খুব কাছের অনুভূতি। ‘ও আমার প্রেম’ অ্যালবামের ‘চলে গেছ অতশী’ আর ‘পদ্মপাতার জল’ ছিল আরও নরম, আরও ভাঙা ও গভীর আবেগের ভাষা।

‘নকশিকাঁথা’ অ্যালবামের ‘বড় অচেনা’, ‘হাত দিয়ে যা ছুঁই’, ‘নিঃসঙ্গ আমার প্রেম’—এগুলো যেন নিঃসঙ্গতার একেকটি সংগীতরূপ। ‘আষাঢ়ে শ্রাবণ’ অ্যালবামের ‘সাতটি দেশ আর পাঁচটি সাগর’ আর ‘কিন্নরী’ শ্রোতাকে নিয়ে যেত এক কল্পলোকের দিকে। ‘সন্ধি’ অ্যালবামের ‘বর্ষা আমার চোখের প্রিয় ঋতু’ আর ‘সন্ধি’, ‘সুন্দরী’ অ্যালবামের ‘বিধাতা তুমি ফিরে যাও’—এই গানগুলো সম্পর্কের জটিল আবেগকে তুলে ধরেছে। ‘সাত রঙের কষ্ট’ অ্যালবামের ‘দুই এক্কে দুই’, ‘সাত রঙের কষ্ট’, ‘নিয়ম শাসন বারণ’—এক অ্যালবামের ভেতরেই যেন জীবনের বহু স্তর একসাথে ধরা পড়ে।

এরপর আসে পরিবর্তন। জুয়েল ব্যক্তিগত কারণে গান থেকে সরে যান। বাবু একা ‘সাদাকালো’ অ্যালবাম করেন, যেখানে ‘সাদাকালো’ গানটি হিট হয়। কিন্তু শ্রোতাদের কাছে তখনো সবচেয়ে বড় সত্য ছিল, জুটি ভেঙে গেছে। সেই শূন্যতা কোনো হিট গান দিয়ে পুরোপুরি ভরাট হয়নি। পরে জুয়েলের মৃত্যু সেই অধ্যায়কে আরও বিষণ্ণ করে তোলে। বাবু এককভাবে এগিয়ে গেলেও জুয়েল–বাবু যুগের সেই জাদু আর ফিরে আসেনি।

মাহ্মুদ
প্রিন্স মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত

শওকাত ছিলেন এই সময়ের আরেকটি আলাদা স্বর। তার গানে শহর ছিল, রাস্তা ছিল, মানুষ ছিল একেবারে বাস্তব ভূগোল হয়ে। ‘প্রয়োজন’ অ্যালবামের ‘ভালোবাসা দে’ আর ‘চাচা ঢাকা কতদূর’—গানগুলো যেন শহুরে জীবনকে সরাসরি প্রশ্ন করে । ‘একা উদাসী মনে’ অ্যালবামের ‘উদাসী মনে’, ‘খোদা ভগবান ঈশ্বর’, ‘ঢাকা' গানগুলো উল্লেখযোগ্য৷বিশেষ করে ‘ঢাকা’ গানটি এই শহরের একধরনের আবেগী মানচিত্র তৈরি করে। ‘নদীর বুকে চাঁদ’ অ্যালবামের ‘এক আকাশের তারা’ আর ‘নদীর বুকে চাঁদ’, ‘আঁচল’ অ্যালবামের ‘যেওনা চলে বন্ধু’—সব মিলিয়ে তিনি এক নিজস্ব সাউন্ড-ভূগোল তৈরি করেছিলেন।

এর বাইরে আরও কিছু গান তখন আলোচনায় ছিল। আরমান খানের সুর-সংগীতে বিপ্লবের ‘চান্দের বাত্তি’ ছিল সে সময়ের এক বিশেষ উন্মাদনার নাম। হাসানের কণ্ঠে ‘অযুত লক্ষ নিযুত কোটি’ (‘তিন সত্যি’ অ্যালবাম) এবং ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’ অ্যালবামের ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’ ছিল একেবারেই ভিন্ন ঘরানার অভিজ্ঞতা। কিশোর শাহীনের সুরে ‘মিলেনিয়াম’ অ্যালবামটিও তখনকার শ্রোতাদের মনে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছিল।

এই সাউন্ড-যুগ কেন গুরুত্বপূর্ণ

আশিকুজ্জামান টুলুর ছন্দ ও উদ্ভাবনী সুর ছিল নব্বইয়ের বাংলা রক ও পপের প্রাথমিক কাঠামো নির্মাণের মতো। তার কাজে সুর কখনো অতিরিক্ত জটিল হয়নি, বরং সহজ কিন্তু কার্যকর ছন্দময় প্রবাহ তৈরি করেছে। যেগুলো শ্রোতার সঙ্গে গানের সংযোগ তৈরি করত।

প্রিন্স মাহমুদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার মেলোডি-ড্রিভেন কম্পোজিশন এবং আবেগের পরিবেশ তৈরি করার ক্ষমতা। তার গানগুলো শুধু শোনা যেত না। বরং মনের গভীরে দাগ কাটত৷ এক ধরনের মানসিক স্পেস তৈরি করত, যেখানে শ্রোতা নিজের গল্প খুঁজে পেত।

জুয়েল–বাবুর কাজ ছিল টেক্সচার ভিত্তিক। তাদের দক্ষ যুগলবন্দি একটা স্নিগ্ধ, গভীর ও প্রায় ফিসফিসে সাউন্ড লেয়ার থাকত, যা গানকে শ্রোতাদের খুব একান্ত করে তুলত। এ কারণে তাদের গানগুলো মধ্যবিত্ত আবেগের খুব শান্তভাবে কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিল।

শওকাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার নাগরিক সাউন্ড জিওগ্রাফি। তার গানগুলো শহরকে শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার না করে শহরকে নিয়ে গান বানিয়েছে।

জুয়েল–বাবু। ছবি: সংগৃহীত

নব্বই থেকে শূন্য দশকের এই গানগুলো এখন ফিরে শুনলে মনে হয়,এগুলো শান্তভাবে একটা সময়ের জীবন্ত নথি ছিল। ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগে, যখন স্ট্রিমিং ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, তখন এই অ্যালবামগুলোই ছিল মানুষের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র পথ।

আর সেই পথ দিয়ে যে অনুভূতিগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল, সেগুলো আজও কোথাও না কোথাও নিঃশব্দে, অবিরত বেজে চলে।