এফডিসিতে সালমান শাহর যত স্মৃতি
মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পরও সিনেমাপ্রেমীদের মনে আজও রয়ে গেছেন ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় তার। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন দশক।
তার অভিনীত সিনেমা, গান, ছবি, স্মৃতিসহ দর্শকের হৃদয়ে যে ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল, সেটি আজও অমলিন।
তার ভক্ত—যারা তাকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, এফডিসিজুড়ে সালমান শাহ অভিনীত কোনো দৃশ্য কিংবা গানের শুটিং হয়েছে—এমন জায়গাগুলো একনজর দেখতে বারবার ছুটে আসেন। কারণ, সেখানে সালমান শাহর স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে।
এফডিসির ভেতরে ঝর্ণা স্পটে সালমান শাহ অভিনীত শিবলী সাদিক পরিচালিত ‘মায়ের অধিকার’ সিনেমার ‘জাহান মঞ্জিল’ নামের বাড়িটি বানানো হয়েছিল। সেখানকার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সালমান শাহর বলা সংলাপ আজও স্মরণীয়।
সেই স্মৃতিটুকু একনজর দেখতে আসেন নায়কের ভক্তরা। এই সিনেমায় আরও অভিনয় করেন—ববিতা, আলমগীর, ফেরদৌসী মজুমদার, হুমায়ূন ফরিদী ও শাবনাজ। একই স্পটে সালমান শাহ ও চিত্রনায়িকা শিল্পী অভিনীত রানা নাসের পরিচালিত ‘প্রিয়জন’ সিনেমার ‘এ জীবনে যারে চেয়েছি’ গানের শুটিং হয়েছিল।
অন্যদিকে, এফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাবের সামনে সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত দিলীপ সোম পরিচালিত ‘মহামিলন’ সিনেমার ‘আমি যে তোমার প্রেমে পড়েছি’ গানটার শুটিং হয়।
পাশাপাশি এফডিসির ক্যান্টিনের সামনের মাঠজুড়ে সালমান শাহ-শাবনূর অভিনীত মোহাম্মদ হান্নান নির্মিত ‘বিক্ষোভ’ সিনেমার ‘একাত্তরের মা জননী, আমরা তোমার মুক্তিসেনার দল’ গানের শুটিং এবং কলেজের ক্যাম্পাস বানানো হয়েছিল।
ভক্তরা এইসব স্মৃতি প্রতিনিয়ত দেখতে আসেন। কোনো ক্লান্তি নেই তাদের। সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ‘জীবন সংসার’ সিনেমার ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু থেকে থাকে’ গানের শুটিং এফডিসিতেই।
এখানকার ক্যান্টিনের সামনে ‘চাওয়া পাওয়া’ সিনেমার একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল। তাই সালমান ভক্তদের এই আকর্ষণ।
তিন দশকের দীর্ঘ সময়ে এক প্রজন্ম বড় হয়ে যায়, আরেকটি প্রজন্ম আসে। তাদের সবার কাছে চির আকর্ষণীয় সালমান শাহ। আজও তার ফ্যাশন ও স্টাইল তারুণ্যের প্রতীক। তার পোশাক, চুলের কাট, সানগ্লাস, হাঁটার ধরন—সবকিছুই অনুসরণ করেন অনেক তরুণেরা।
এটাই সালমান ম্যাজিক। তিনি যেমন সময়কে ধারণ করেছিলেন, আবার নিজের সময় থেকে অনেকটা এগিয়েও ছিলেন। সালমান শাহ শুধু নব্বইয়ের দশকের নায়ক নন; তিনি বাংলাদেশের সিনেমার এক সবুজ অধ্যায়।
সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পরও তার অভিনীত সিনেমা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন নতুন প্রজন্মের দর্শক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নায়কের ছবি, ভিডিও, গান ও সিনেমার দৃশ্য নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট কোনো প্রজন্মের মধ্যে তিনি আটকে নেই। মৃত্যুর তিন দশক পরও নতুন প্রজন্ম নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করছে এই ক্ষণজন্মা নায়ককে।
মাত্র চার বছরের অভিনয় জীবনে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। সিনেমায় তার অভিষেক হয়েছিল ১৯৯৩ সালে মৌসুমী অভিনীত ও সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। তারপর মৌসুমীর সঙ্গে জুটি হয়ে ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’ ও ‘স্নেহ’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
১৯৯৪ সালে সালমান শাহ-শাবনূর প্রথম জুটি হন জহিরুল হক পরিচালিত ‘তুমি আমার’ ছবিতে। এরপর একে একে ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘বিচার হবে’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভিতর আগুন’সহ ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেন।
শাবনাজ প্রথমে সালমান শাহর সঙ্গে ‘আঞ্জুমান’ সিনেমায় জুটি বাঁধেন। এরপর একসঙ্গে অভিনয় করেন ‘আশা ভালোবাসা’ ও ‘মায়ের অধিকার’ সিনেমায়। দর্শকপ্রিয়তা ও প্রশংসা পেয়েছে এই জুটিও।
সালমান শাহ অভিনীত অন্য সিনেমাগুলো হলো জীবন রহমান পরিচালিত ‘প্রেম যুদ্ধ’, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘কন্যাদান’, হাফিজ উদ্দিন পরিচালিত ‘আঞ্জুমান’, মালেক আফসারী পরিচালিত ‘এই ঘর এই সংসার’ ইত্যাদি।
এছাড়া রয়েছে, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ও ‘শুধু তুমি’। তার অন্য নায়িকারা হলেন—শাহনাজ, শিল্পী, লিমা, সোনিয়া, কাঞ্চি, সাবরিনা, বৃষ্টি ও শ্যামা। প্রতিটি জুটিতেই নিজস্ব অভিনয়শৈলী ফুটিয়ে তুলেছিলেন সালমান শাহ। প্রতিটি নায়িকা সেই যুগের সাফল্য ও স্মৃতির অংশ হয়ে আছেন।
কিছু নায়ক পর্দায় আসেন, দর্শকের ভালোবাসা পান, তারপর সময়ের সঙ্গে তাদের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে মুছে যায়। কিন্তু সালমান শাহ আজও রয়ে গেছেন।
সিনেমা হলের পাশাপাশি বিনোদন জগতে এসেছে টেলিভিশন, ইউটিউব ও নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। অথচ তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি তিন দশকেও।
এদিকে, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে চিত্রনায়ক সালমান শাহের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত চলছে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা আলোচনা-জল্পনা রয়েছে। এটা নিয়ে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
ওই মামলায় গত ৯ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বাংলা সিনেমার খল অভিনেতা ডন-কে। হয়তো একদিন আসল কারণ প্রকাশ হবে। তবে ৩০ বছর ধরেও ভক্তদের মনে অমলিন রয়ে গেছেন সালমান শাহ।