সাক্ষাৎকার

‘যে জীবনে অর্ধেকের বেশি সময় অভিনয় করেছি সে জীবন মিস করি’

শাহ আলম সাজু
শাহ আলম সাজু

একটা সময় টেলিভিশনের নাটকে প্রচুর কাজ করেছেন তমালিকা কর্মকার। নাটক ও চলচ্চিত্র ছাড়াও আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৩০ বছর।

‘কীর্তনখোলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। সাড়া জাগানো ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে সুমা চরিত্রে অভিনয় করেও আলোচিত হন তিনি। 

বেশ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এককালের তুমুল জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেশ থেকেই টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের অন্যতম, প্রয়াত সালমান শাহর সঙ্গে সিনেমায় অভিনয় করেছেন তমালিকা কর্মকার। সালমান শাহর সঙ্গে নাটকও করেছেন। ছোটবেলা থেকেই সালমান শাহ তার পরিচিত ছিলেন।

‘সালমান শাহর কথা মনে পড়লেই কান্না চলে আসে। সবাই তো তাকে সালমান শাহ বলে ডাকেন, এই নামেই চেনেন। আমার কাছে সে ইমন। ইমন আমার ছোটবেলার বন্ধু। খুব ভালো বন্ধু’, যোগ করেন তিনি। 

তমালিকা বলেন, ‘তখন আমরা শাহজাহানপুরে থাকতাম। ওই সময় সালমান শাহ আমার বাসায় প্রচুর এসেছে। ভীষণ ভালো বন্ধু ছিল সে। এত গুড লুকিং ছিল!’

দ্য ডেইলি স্টার: সালমান শাহর সঙ্গে সিনেমা করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

তমালিকা কর্মকার: ‘এই ঘর এই সংসার’ সিনেমায় আমরা অভিনয় করেছি একসঙ্গে। শুটিং শেষে প্রতিদিন সালমান শাহ আমাকে বাসায় দিয়ে যেতেন। ভালো মানুষ ছিলেন। মন খারাপ হলেই আমার বাসায় আসতেন। খুব মিস করি। সে আমার হার্ট।’

তমালিকা কর্মকার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি নাচ, গান ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সাড়ে তিন বছর বয়সে আমি প্রথম অভিনয় করি। পারিবারিকভাবে সুন্দর একটা কালচারাল পরিবেশ পেয়েছিলাম। মা তো আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাচ, গান শেখাটা পরিবার থেকেই হয়েছিল। শিশুশিল্পী হিসেবে অনেকগুলো কাজ করেছি এবং অনেক পুরস্কারও পেয়েছি।’

প্রথম নায়িকা হওয়ার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, ‘তখন আমার কিশোরী বয়স। “হার মানা হার” নামে একটি নাটকে জীবনে প্রথমবারের মতো নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করি। সেটা বিটিভির নাটক ছিল। নাটকের গল্পে একজন কিশোরী মেয়ে হঠাৎ একদিন নায়িকা হয়ে গেল।’ 

‘কিন্তু, তার আগে অনেক নাটকে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল ছোটবেলায়’, যোগ করেন তিনি। 
তমালিকা বলেন, ‘ওই নাটকের প্রযোজক ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ওই নাটকটি দর্শকরা সাদরে গ্রহণ করেছিল। নাটকের গল্পে একজন কিশোরী মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক এক ব্যক্তির প্রেমে পড়ে।’

‘কোথাও কেউ নেই’ নামের সাড়া জাগানো নাটকে সুমা চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তা পান তমালিকা। 

তমালিকা কর্মকার বলেন, ‘এই নাটকের প্রযোজক ছিলেন বরকতউল্লাহ আংকেল। হুমায়ূন আহমেদের লেখা কালজয়ী নাটক। এদেশে প্রথম কোনো নাটকের জন্য রাজপথে মিছিল হয়েছিল বাকের ভাইয়ের জন্য। কী দুর্দান্ত সময় পার করে এসেছি!’

তমালিকা কর্মকার বলেন, ‘বরকতউল্লাহ আংকেল একদিন আমাকে ডাকেন। হুমায়ূন আহমেদ আমার কথা বলা দেখে তখন বলেছিলেন, বাচ্চাদের মতো করে কথা বলো, এভাবেই কথা বলতে হবে। তুমি যেভাবে কথা বলো, এভাবেই নাটকে কথা বলবে। তারপর শুটিং করলাম। নাটক প্রচার শুরু হলো। চারদিকে ব্যাপক সাড়া পড়ে গেল। হইচই পড়ে গেল। দারুণ ভালো লাগল।’

তমালিকা বলেন, ‘নাটকে কারাগারের কিছু দৃশ্য ছিল। কেন্দ্রীয় কারাগারে ওই দৃশ্যগুলোর শুটিং হয়েছিল। ওই নাটকের জন্য সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ূন আহমেদ, বরকতউল্লাহ আংকেল—উনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’
‘সুমা চরিত্রের জন্য অনেক প্রশংসা পেয়েছি। নাটকটির জন্য দর্শকদের কাছ থেকে প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি। এখনো নাটকটির কথা মনে হলে আমাকে নাড়া দেয়’, বলেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টার: অভিনয় নিয়ে কোনো আক্ষেপ কাজ করে কি?

তমালিকা কর্মকার: ‘নাটকের গোল্ডেন টাইমে অভিনয় করেছি। সেজন্য আক্ষেপ নেই।’

দ্য ডেইলি স্টার: নিজেকে স্টার মনে করেন?

তমালিকা কর্মকার: ‘নিজেকে স্টার মনে করি না। আমি একজন অভিনয়শিল্পী। সবসময় তাই মনে করি। স্টার ভাবি না। আমার আলাদা একটা ইমেজ আছে।’

তমালিকা কর্মকার প্রথম যে সিনেমায় অভিনয় করেন, তার পরিচালক ছিলেন শেখ নিয়ামত আলী। সিনেমার নাম ‘অন্য জীবন’।  

দ্য ডেইলি স্টার: অভিনয় জীবন কতটা মিস করেন?

তমালিকা কর্মকার: ‘লাইট, ক্যামেরা খুব মিস করি। যে জীবনে অর্ধেকের বেশি সময় অভিনয় করেছি, সেই জীবন ভীষণ মিস করি। অভিনয় আমার কাছে বড় কিছু।’

তিনি বলেন, ‘স্কুল জীবন থেকে শিল্পচর্চা আর বই পড়া টানত। ক্লাস টেনে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়ছি। পারিবারিকভাবে বই পড়ার অভ্যাস ছিল।’

নাচের বিষয়ে তমালিকা কর্মকার বলেন, ‘সেই সময় নাচের এত সুযোগ ছিল না। নাচ পেশা হিসেবে নেওয়া যেত না। অভিনয়ই করতে হয়েছে। অভিনয় যা করেছি, গড গিফটেড।’

তমালিকা কর্মকার বলেন, ‘১৯৯২ সালে আমি আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হই। এরপর তো টানা ৩০ বছর অভিনয় করেছি মঞ্চে। বেশ কিছু ভালো ভালো কাজ করার সুযোগ হয়েছে মঞ্চে। ঢাকার মঞ্চে অনেক প্রশংসিত নাটকে অভিনয় করেছি।’

‘আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে অভিনয়’, যোগ করেন তিনি।