৩৭০০ কুমির নিয়ে কেমন চলছে ভালুকার ‘রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড’

মো. আমিনুল ইসলাম
মো. আমিনুল ইসলাম

ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমিরখামার ‘রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড’ বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ঘন ঘন মালিকানা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় চরম ব্যবসায়িক মন্দার কবলে পড়েছে।

১৫ একর জমির ওপর দুই দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত কুমির প্রজনন খামারটি দীর্ঘ সময়েও প্রত্যাশিত সাফল্যের মুখ দেখেনি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত চারবার খামারটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পরিবর্তন হলেও এর ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন ঘটেনি।

করোনা মহামারির সময় খামারটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এর পাশাপাশি অসংখ্য কুমির মারা যায়। ফলে এক সময়ের সম্ভাবনাময় এই খামার থেকে কুমিরের চামড়া রপ্তানির কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

খামারের ব্যবস্থাপক ড. আবু সাইম মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ব্যবসার জন্য মহামারি ছিল দুঃস্বপ্ন, আমরাও এর প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলাম না।’

তিনি জানান, বর্তমানে খামারে প্রায় তিন হাজার ৭০০ কুমির রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০০টি প্রজনন পর্যায়ে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি কুমিরের চামড়া সংগ্রহযোগ্য। চামড়া সংগ্রহের উপযোগী হতে একটি কুমিরের প্রায় তিন বছর সময় লাগে। তবে প্রজননক্ষম হতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ বছর। বর্তমানে খামারে থাকা কুমিরের সংখ্যা এর ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।

কুমিরের খামার
ছবি: স্টার

ড. আরিফ বলেন, ‘খামারের ধারণক্ষমতা প্রায় ৪০ হাজার কুমির। শুরুতে আমরা ২০ হাজার কুমিরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম, কিন্তু তা এখনো পূরণ হয়নি।’

খামারটি ২০২২ সালে ৪০০টি কুমিরের চামড়া রপ্তানির বকেয়া অর্ডার পূরণ করতে পারেনি। এ ছাড়া ২০২৩ সালের শুরুর দিকে ৫০০টি চামড়া রপ্তানির পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে, অর্থাৎ মহামারির আগে, খামারটি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করে।

প্রথম ২০১৪ সালে এই খামার থেকে জাপানে ৪৩০টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি হয়, যার মূল্য ছিল প্রায় দুই লাখ মার্কিন ডলার। ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৫০৭টি চামড়া রপ্তানি করা হয়েছে, যা বছরে এক হাজারটি চামড়া রপ্তানির প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে বার্ষিক চামড়া রপ্তানি শূন্যে নেমে এসেছে বলে জানান ডা. আরিফ।

আন্তর্জাতিক বাজারে একটি কুমিরের চামড়ার গড় মূল্য ৬০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলার। এসব চামড়া দিয়ে বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট, বুটসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা হয়ে থাকে।

অস্থির যাত্রাপথ

প্রয়াত লেখক মুশতাক আহমেদ এবং উদ্যোক্তা মেসবাহুল হক ২০০২ সালে কুমির খামার স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ২০০৪ সালের মে মাসে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে তারা যৌথভাবে পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগে খামারটি চালু করেন, যার ৪৯ শতাংশ অর্থায়ন ছিল সরকারের ইকুইটি অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনার ফান্ড (ইইএফ) থেকে সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে।

কুমিরের খামার
ছবি: স্টার

এরপর ২০১২ সালে খামারটি পিকে হালদারের কাছে বিক্রি করা হয়। ২০২০ সালে পিকে হালদারের দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তার মালিকানা বাতিল করা হয়। আইনি জটিলতার কারণে প্রায় দুই বছর খামারটি পরিত্যক্ত ছিল। পরে ২০২২ সালে হাইকোর্ট একটি কমিটি গঠন করেন খামার পরিচালনার জন্য।

খামারের কাছে ১০০ কোটিরও বেশি টাকা পাওনা থাকায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে খামারটি বিক্রি করে দেয়।

বেসরকারি সংস্থা ‘উদ্দীপন’ বর্তমানে খামারটির মালিক। নতুন মালিক এখনো খামারের ব্যবসা পুনরায় চালু করতে পারেনি এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে খামারটি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

উদ্দীপনের প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপদেষ্টা মীর খায়রুল আলম জানান, ব্যবসা পুনরায় চালু করতে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

মালিকানা পরিবর্তনের কারণে কুমিরের চামড়া রপ্তানি পুনরায় শুরু করতে নতুন করে সার্টিফিকেশন নিতে হবে। এ জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, খামারটিকে যৌথ মূলধনী কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধনের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, ‘খামারটি স্থবির অবস্থায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকায় আমরা ব্যবসা করতে পারছি না অথচ কুমিরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।’

কুমিরের খামার
ছবি: স্টার

অপার সম্ভাবনা

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো রফিকুল আলম বলেন, এই খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে হলে সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু চামড়ার ওপর নির্ভর না করে উপজাত পণ্য এবং কুমিরের মাংসের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

খুলি, হাড়, নখ এবং চামড়ার বর্জ্য দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে প্রতিটি কুমির থেকে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ৮০০ ডলার আয় করা সম্ভব। কুমিরের হাড় দিয়ে তৈরি চারকোল বিশ্বজুড়ে পারফিউম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

তিনি আরও বলেন, কুমিরের মাংস অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় যেখানে প্রতি কেজির দাম ৩০ থেকে ৩৫ ডলার।

এই অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশে কুমিরের মাংস রপ্তানির অনুমতি না থাকায় চামড়া সংগ্রহের পর তা ফেলে দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভিজাত হোটেলগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের জন্য এই মাংস সরবরাহ করা যেতে পারে যা থেকে বছরে ৫ থেকে ৬ মেট্রিক টন মাংস বিক্রি করে ভালো আয় করা সম্ভব।

একটি কুমিরকে তিন বছর লালন-পালনের খরচ প্রায় ৩০০ ডলার এবং চামড়া বিক্রি করে ৬০০ থেকে ৭০০ ডলার আয় করা সম্ভব বলে জানান ডা. আলম।