তারল্য সংকটে ১২ লাখ গ্রাহকের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বিমা দাবি বকেয়া
ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ২০১২ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির একটি বিমা পলিসি নেন বেসরকারি চাকরিজীবী মনজুর রহমান। ২০২২ সালে তার পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হয়। ১১ লাখ ১৯ হাজার টাকার বিমা দাবির জন্য তিনি সব প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছেন। কিন্তু, আজ পর্যন্ত একটি টাকাও পাননি।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘কোম্পানির সঙ্গে যখনই টাকা ফেরত চাইতে যোগাযোগ করি, তখন আজ না কাল বলে ঘোরাতে থাকে। নানা অজুহাত দেয়। এমনকি আমার বাবা যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখন অনুরোধ করেছিলাম কিছু টাকা হলেও দিতে। তাও তারা দেয়নি।’
অথচ, বিমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সব নথি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলোকে দাবি নিষ্পত্তি করতে হয়।
গভীর তারল্য সংকটে থাকা এই খাতে জীবন বিমা গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর বিলম্বের মধ্যে রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহক ২৯টি কোম্পানির কাছ থেকে বিমা দাবির টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন এবং বকেয়া দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা।
এরপর সময় যত গড়িয়েছে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩২টি বিমা কোম্পানির প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের বিমার মেয়াদ পূর্ণ হলেও এখনো অর্থ পাননি।
তার মধ্যে সাতটি কোম্পানি বকেয়া পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে পুঞ্জিভূত অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায়।
কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের জন্য আর্থিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, মন্দ বিনিয়োগ, উচ্চ ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আর্থিক চাপ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে কোম্পানিগুলো এখন সম্পদ বিক্রি, ঋণ গ্রহণ এবং ঘুরে দাঁড়ানোর নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে পুনরায় গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছে।
গত এক বছরে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করেছে, যা মোট দাবির ৬৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অথচ, আইডিআরএ-এর তথ্য অনুযায়ী, জীবন বিমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির হার ২০২০ সালেও ছিল ৮৫ শতাংশ। যেখানে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমা দাবি নিষ্পত্তির বৈশ্বিক গড় প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ এবং প্রতিবেশী ভারতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ফারইস্ট
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সে ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার বিমা দাবি থাকলেও পরিশোধ করেছে মাত্র ২১৪ কোটি টাকা। ফলে, তাদের ৫ লাখ ৬৬ হাজার গ্রাহকের এখনো ৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
২০২১ সালের এপ্রিলে আইডিআরএ-এর নির্দেশে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি পরিচালিত এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, কোম্পানিটির ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৪৩২ কোটি টাকার হিসাবে অনিয়ম রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিমূল্যে জমি কেনা এবং কোম্পানির মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্টস (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে মূলত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এমটিডিআর হলো মুদারাবা পদ্ধতিভিত্তিক একটি মুনাফা হিসাব, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমা রাখা অর্থের ওপর রিটার্ন পাওয়া যায়।
আরও কয়েকটি জীবন বিমা কোম্পানি খারাপ পারফরম্যান্স করেছে। পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স ২৮০ কোটি ৮১ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র ১১ কোটি ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। আর প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ২০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার মধ্যে ৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিষ্পত্তি করেছে।
গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্স ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ২৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে ১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা নিষ্পত্তি করেছে। বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা দিতে পেরেছে।
ফলে বায়রা লাইফের ৩৩ হাজার ১৩১ জন, গোল্ডেন লাইফের ১৮ হাজার ৩৩১ জন, পদ্মা লাইফের ২ লাখ ৩৫ হাজার, প্রগ্রেসিভ লাইফের ৪২ হাজার ১৬২ জন এবং সানফ্লাওয়ার লাইফের ৮৪ হাজার ৯৪৩ জন বিমাকারীর টাকা এখনো পরিশোধ করা বাকি।
অপরদিকে, আকিজ তাকাফুল লাইফ ইনস্যুরেন্স, আলফা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, লাইফ ইনস্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবং মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স সব দাবি নিষ্পত্তি করেছে।
কী বলছে বিমা কোম্পানিগুলো
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবদুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, অতীতের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও তহবিল আত্মসাতের কারণে কোম্পানিতে দাবির জট সৃষ্টি হয়েছে এবং তীব্র তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পরিচালনা পর্ষদ ২০২৬ সালের মধ্যে কিছু জমি বিক্রির পরিকল্পনা করেছে। নগদ প্রবাহ বাড়াতে ঋণও নিতে পারে।’
এ বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি পরিশোধের লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সিইও নূর মোহাম্মদ ভূঁইয়া বলেন, ২০১০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন ও প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে থাকার সময়ও রয়েছে।
তিনি বলেন, আগের পরিচালনা পর্ষদ যেসব জমি ও ভবনে বিনিয়োগ করছে, তখন যে দামে সেগুলো কেনা হয়েছিল এখন বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে তার দাম অনেক কম। সম্পদ বিক্রির জন্য আমাদের কাছে আইডিআরএ-এর অনুমোদন আছে। বিক্রির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্সের সিইও আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী বলেন, বকেয়া দাবি ও সীমিত তহবিলের কারণে কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুই মাস আগে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে আমরা ঋণের আবেদন করেছি। ২০–২৫ কোটি টাকা পেলে ছোট কোম্পানিগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি জানানো হয়নি।
তিনি ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে হওয়া অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। যেমন: মাঠকর্মীরা বিমা বিক্রি করে সেই পলিসির তথ্য ও রসিদ প্রধান কার্যালয়ে পাঠায়নি। ফলে, সেসব বিমা দাবি পরিশোধে জট সৃষ্টি করেছে। এমন আরও অনেকগুলো কারণ জানান তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপারেশনাল ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক দাবি নিষ্পত্তি থেমে যায়।
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরশেদ আলম সিদ্দিকী জানান, তার কোম্পানিটি তারল্য সংকটে ভুগছে এবং এ কারণে বিমা দাবি পরিশোধ করার গতি কম।
তিনি স্বীকার করেন, অতীতের অব্যবস্থাপনা ও তহবিল আত্মসাতের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য দায়ী।
তিনি বলেন, ‘নগদ প্রবাহ বাড়াতে আমরা বেশকিছু জমি বিক্রির চেষ্টা করছি। কিন্তু, ক্রেতারা কেনা দামের চেয়েও কম দাম দিতে চাইছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে যতবারই চেষ্টা করা হয়েছে একই অবস্থা ছিল।’
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের সিইও সাইদুল আমিন বলেন, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের অব্যবস্থাপনা এবং ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জমি ক্রয়ে অনিয়মের মাধ্যমেই তারল্য সংকট ও দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়েছে। প্রায় ৩০ কোটি টাকার মন্দ বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আমাদের বোর্ড পুনর্গঠন করেছে। আমরা এখন পরিকল্পনামাফিক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছি।
শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
দেশের বিমা কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সহ-সভাপতি এবং ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্সের স্পন্সর পরিচালক আদিবা রহমান বলেন, দাবি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা।
তিনি বলেন, ‘অনেক কোম্পানি পরিচালিত হচ্ছে প্রায় শূন্য তহবিল নিয়ে। দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের অর্থ অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় বা ব্যক্তি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগে ব্যয় করা হয়। ফলে মারাত্মক তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, অনেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা জনআস্থা দুর্বল করেছে এবং ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো তহবিল ঘাটতি এবং এই খাতের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস।’
যা বললেন বিশেষজ্ঞ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বিমা বিভাগের অধ্যাপক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা বিমা খাতের ২০২৪ সালের দুর্বল পারফরম্যান্স ২০২৫ সালেও প্রভাব ফেলেছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘অনেক কোম্পানি বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আয় করতে পারেনি। ফলে দাবি পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবেও দাবি পরিশোধ করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি বিমা কোম্পানিগুলো অলাভজনক অবস্থায় প্রচুর বিমা দাবি ঝুলিয়ে নিয়ে বসে আছে। আবার অনেক কোম্পানি দাবি নিষ্পত্তি করতে চায় না। কারণ, তারা মনে করে এর পরও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো আইনি ব্যবস্থাই নেওয়া হবে না।’
তিনি সতর্ক করেন, দুর্বল কোম্পানিগুলো একীভূতকরণ ও বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বিমা সম্প্রসারণের মতো সংস্কার করা না হলে এই খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না।
নিয়ন্ত্রকদের যৎসামান্য ব্যবস্থা
আইডিআরএ-এর সদস্য (লাইফ) মো. আপেল মাহমুদ বলেন, কোম্পানিগুলোর কার্যপ্রণালীতে বড় ধরনের অসঙ্গতির কারণে বিমা দাবি নিষ্পত্তির হার কমেছে।
তিনি বলেন, সম্ভবত অর্থ আত্মসাতের কারণে অব্যবস্থাপনার এই সমস্যা আরও বেড়েছে। যদিও কী পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে তার সঠিক পরিমাণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
কিছু কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ দ্রুত দাবি নিষ্পত্তিতে আগ্রহী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও সীমাবদ্ধতা আছে। আইন অনুযায়ী আইডিআরএ বিমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত বা নিবন্ধন বাতিল করতে পারে। কিন্তু, এখন এমন কিছু করা হলে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।’