রেশম কারখানায় ঈদের ব্যস্ততা, মৌসুমি কেনাকাটায় গতি
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে রাজশাহী ও রেশম—এই দুই শব্দ যেন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবারের ঈদুল ফিতর বসন্তের মাঝামাঝি উষ্ণ আবহাওয়ায় পড়ায় রাজশাহীর সিল্কের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফলে শহরের রেশম কারখানাগুলোতে এখন উৎসবের ব্যস্ততা, একই সঙ্গে গতি পেয়েছে মৌসুমি কেনাকাটাও।
রাজশাহী রেশম বর্তমানে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এই বিশেষ স্বীকৃতি ঐতিহ্যবাহী এই কাপড়ের মর্যাদা ও অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। অনেক ক্রেতার কাছে রেশমের পোশাক পরা কেবল ফ্যাশনের বিষয় নয়, বরং এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ধারণ করার মাধ্যম।
প্রতি বছর ঈদ, পূজা ও অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর এই আইকনিক কাপড়ের চাহিদা নতুন করে বাড়ে। এবারো ঈদকে ঘিরে কেনাকাটার মূল ব্যস্ততা চোখে পড়ছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্প এলাকায় অবস্থিত রেশমের শোরুমগুলোতে।
সেখানে বেশ কয়েকটি বেসরকারি রেশম কারখানা তাদের নিজস্ব উৎপাদন ইউনিটের পাশাপাশি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করছে, যেখানে ভিড় করছেন শৌখিন ক্রেতারা।

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, সপুরা সিল্ক মিলস লিমিটেডে কর্মচাঞ্চল্য ততই বাড়ছে। কারখানার একপাশে অবিরাম চলছে তাঁত, আর অন্যপাশে কর্মীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন সুতা রং করা, শাড়ি বোনা এবং কাপড়ে সূক্ষ্ম হাতের কাজ যোগ করার কাজে।
১৯৮০ সাল থেকে চালু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের কারখানা প্রাঙ্গণেই রয়েছে একটি বিশাল শোরুম। সেখানে শোভা পাচ্ছে সারি সারি বাহারি পোশাক—যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী শাড়ি, পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি, থ্রি-পিস, শার্ট এবং বিভিন্ন ধরনের স্কার্ফ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান জানান, প্রতি বছরই ঈদের সময় ক্রেতাদের ভিড় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তার মতে, দুই ঈদেই ব্যবসা ভালো হয়, তবে ঈদুল ফিতরে সাধারণত ভিড় ও চাহিদা বেশি থাকে। এখানে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে বলাকা সিল্ক ও র-সিল্কসহ নানা বৈচিত্র্যের কাপড়।
গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে রেশমি পোশাকের দামে ভিন্নতা দেখা যায়। সাইদুর রহমান বলেন, 'আমাদের শাড়ির দাম সাধারণত তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার বা ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।' তিনি মনে করেন, রাজশাহীর রেশম ঐতিহ্যবাহী হওয়ার কারণেই আজও বাজারে এর চাহিদা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ঈদের পোশাক খুঁজতে সপুরা সিল্কে আসা ক্রেতা নাসিমা খানম বলেন, বিশেষ উপলক্ষে রেশমই তার প্রথম পছন্দ। তিনি বলেন, 'এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। অন্য কাপড়ের সঙ্গে রেশমের তুলনাই হয় না। রেশম কাপড়টি খুবই আরামদায়ক। দাম একটু বেশি হলেও আমি রেশমই পছন্দ করি।'
আরেক ক্রেতা তাসনিয়া হোসনে আফরিন বলেন, এবার ঈদ পড়েছে বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে। শীত শেষ হয়ে আবহাওয়া ধীরে ধীরে উষ্ণ হচ্ছে। এই আবহাওয়ায় রেশমের পোশাক বেশ আরামদায়ক। তিনি বলেন, 'গরমের সময়ে রেশম খুব আরামদায়ক। মানুষ এখন আরামকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।'
বেসরকারি শোরুমগুলোতে যখন উৎসবমুখর কেনাবেচা চলছে, তখন শহরের শিরোইল এলাকায় অবস্থিত সরকারি রাজশাহী রেশম কারখানার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে আনা হয়।

এক সময় দেশের রেশম সুতার চাহিদা পূরণে এই কারখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তবে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে ২০০২ সালে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮ সালে এটি আবার সীমিত পরিসরে চালু করা হয়। বন্ধ হওয়ার সময় এখানে ৬৩টি তাঁত ছিল এবং বছরে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার গজ রেশমি কাপড় উৎপাদিত হতো।
কারখানাটির স্বর্ণযুগে যেখানে প্রায় ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে সেখানে মাত্র ২০ জন শ্রমিক দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করছেন। বর্তমানে ২০টি পাওয়ারলুম সচল রয়েছে, যেখানে বছরে প্রায় ছয় হাজার মিটার রেশমি কাপড় উৎপাদিত হয়।
কারখানাটির সাবেক ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুনরায় চালু হওয়ার পর এখানে বিভিন্ন ধরনের রেশমি পণ্য তৈরি ও বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'কারখানা চালু হওয়ার পর আমরা গরদ শাড়ি, প্রিন্টেড শাড়ি, টু-পিস পোশাক, স্কার্ফ, শাল, মটকা কাপড়, ধুপিয়ান কাপড়, বলাকা কাপড় এবং প্রিন্টেড কাপড় তৈরি ও বিক্রি শুরু করেছি।'
তিনি জানান, এক সময় দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এই কারখানার শোরুম ছিল। এখন কেবল একটি বিক্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে।
সপুরার মতো এই কারখানার প্রাঙ্গণেও একটি ছোট বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। তবে প্রচারের অভাবে সেখানে ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। বিক্রি হতাশাজনক হলেও কয়েক দশকের পুরোনো ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কারখানাটি কোনোভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
রেশম সুতা তৈরি হয় রেশমকীট বা স্থানীয় ভাষায় পলু পোকার মাধ্যমে। রেশম উৎপাদনের জন্য বিপুলসংখ্যক পোকা প্রয়োজন পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি টাই তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ২৫০টি রেশমকীটের। একটি শাড়ি তৈরি করতে লাগে প্রায় পাঁচ হাজার রেশমকীট, আর একটি শার্ট তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় আড়াই হাজার রেশমকীট।

বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো লিয়াকত আলী বলেন, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে রেশম সুতার চাহিদা ছিল প্রায় ২০০ টন। এর অর্ধেক দেশেই উৎপাদন হতো, আর বাকি অর্ধেক আমদানি করা হতো।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৫০০ টন রেশম সুতার চাহিদা রয়েছে। তবে দেশীয় উৎপাদকরা মাত্র চার টনের মতো সরবরাহ করতে পারছেন। বাকি প্রায় সবই আমদানি করতে হচ্ছে। কম শুল্কের কারণে চীন থেকে আমদানি করা সুতা এখন অনেক সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে বাজারে চীনা সুতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশীয় সুতার চাহিদা কমে গেছে। চীনা সুতার এই প্রবাহ স্থানীয় বাজারে আধিপত্য বিস্তার করায় তুঁত নার্সারিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রেশমকীটের খাদ্য হলো তুঁত পাতা। তাই রেশমচাষের জন্য বিশেষভাবে তুঁত নার্সারি গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এখন অনেক বেসরকারি নার্সারি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে হাজারো রেশমচাষি অন্য ফসলে চলে গেছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র ১১টি তুঁত নার্সারি চালু রয়েছে।