বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস

গুহাচিত্র থেকে মুঠোফোন, যেভাবে বদলেছে ছবির ভাষা

জাহিদ হাসান জয়

আবাহমানকাল থেকেই মানুষের মধ্যে নিজের অস্তিত্বকে ধরে রাখার চেষ্টা রয়েছে। নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া, স্মৃতিকে স্থায়ী করা কিংবা কোনো অনুভূতি প্রকাশের তাগিদ থেকেই মানুষ ধীরে ধীরে শিল্প ও সাহিত্যের পথে এগিয়েছে। এই ধারারই একটি অংশ চিত্রকলা। মানুষ যা দেখে বা যা দেখাতে চায়, তা ধরে রাখার চেষ্টা থেকেই এর বিকাশ। প্রাচীন মানুষের গুহাচিত্র থেকে আধুনিক আলোকচিত্র, এই দীর্ঘ যাত্রা মূলত সেই স্থায়িত্বেরই গল্প।

মানুষ যখন বুঝতে শিখল, আলো চোখ থেকে বা বস্তু থেকে নয়, বরং আলোর উৎস থেকে আসে, তখনই আলোকচিত্র ধারণের পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ফটোগ্রাফি হয়ে উঠল এক ধরনের বৈশ্বিক ভাষা।

ফরাসি উদ্ভাবক নিসেফোর নিয়েপসের ১৮২৭ সালে ‘ভিউ ফ্রম দ্য উইন্ডো অ্যাট ল্য গ্রা’ নামের এই ছবিটি তোলেন। এখন পর্যন্ত টিকে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আলোকচিত্র এটি। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর এক প্রান্তের রঙ, মানুষ, জীবন, হাসি কিংবা কান্না অন্য প্রান্তের মানুষকে যত সহজে একটি ছবির মাধ্যমে অনুভব করানো যায়, অন্য কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে ক্যামেরা যত সহজলভ্য হয়েছে, এর ব্যবহারও তত বেড়েছে। নিছক নথিবদ্ধ করা কিংবা প্রতিকৃতি তোলার বাইরে আলোকচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে শিল্পীর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি। ফ্রেম, কম্পোজিশন ও রঙের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে আলোকচিত্রের নিজস্ব ভাষা।

মানুষ প্রথমে আলোকে একটি বাক্সের মধ্যে বন্দি করার কৌশল শিখেছিল। ক্যামেরা অবস্কিউরা ছিল সেই বাক্স, যা পিনহোল ক্যামেরার আদি রূপ। চোখ কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার পর ক্যামেরা তৈরির পথে অগ্রগতি আরও দ্রুত হয়।

Image
CAMERA OBSCURA
পৃথিবীর প্রথম আলোকচিত্র ধারণের যন্ত্র ক্যামেরা অবসকিউরা। ছবি: সংগৃহীত

১৮২৭ সালে ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ নিসেফোর নিয়েপস প্রথম আলোক সংবেদী প্লেটের মাধ্যমে ছবি ধারণ করতে সক্ষম হন। এ কারণে তাকে ফটোগ্রাফির জনক বলা হয়। প্রায় আট ঘণ্টার এক্সপোজারে তিনি পৃথিবীর প্রথম ছবি তোলেন।

এই প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করতে পরে নিয়েপস ও লুই ড্যাগুইর যৌথভাবে কাজ করেন। নিয়েপসের মৃত্যুর পর ড্যাগুইর ১৮৩৯ সালে সিলভার আয়োডাইডের কোটিং করা কপার প্লেটে আরও কম সময়ে ছবি তুলতে সক্ষম হন। এই পদ্ধতি পরে ড্যাগুয়েরোটাইপ নামে পরিচিতি পায়।

১৮২৭ সালে ক্যামেরা আবিষ্কারের সময় ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। তবে এখানে ক্যামেরা পৌঁছাতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জাহাজে করে এই অঞ্চলে ক্যামেরা আসে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৪০-এর দশকেই কলকাতায় ক্যামেরা চলে আসে। ১৮৫৪ সালের মধ্যে ২০০ সদস্য নিয়ে বোম্বে ফটোগ্রাফিক সোসাইটির যাত্রাও শুরু হয়।

পিনহোল ক্যামেরা। ছবি: সংগৃহীত

তবে পূর্ববাংলা তখনও ফটোগ্রাফির এই নতুন মাধ্যম থেকে অনেকটাই দূরে। প্রায় একই সময়ে ঢাকার নবাবদের আদি পুরুষ খাজা আলীমুল্লাহর একটি ফটোগ্রাফিক নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে সেটিকে পূর্ববাংলায় ফটোগ্রাফির শুরুর ইতিহাস হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় না।

উনিশ শতকের সত্তরের দশক থেকে ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যদের ক্যামেরায় তোলা প্রতিকৃতি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই ফটোগ্রাফি কখনো জমিদারির চার দেয়াল পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তা যথেষ্ট শৈল্পিকও হয়ে উঠতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন লিখেছেন, 'এই রাস্তায় নওয়াবদের দেখতে পাচ্ছি জনবিচ্ছিন্ন এবং শিল্পচেতনা থেকে, অন্তত ক্যামেরা শিল্পের মাপকাঠিতে অনেক দূরের কেউ।'

এই জায়গায় ব্যতিক্রম ছিলেন গোলাম কাসেম, যিনি ড্যাডি নামে পরিচিত এবং বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি জগতের একজন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ১৯১২ সালে হাতে নেওয়া এনসাইন বক্স ক্যামেরা থেকে শুরু করে ১৯৯৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ভিত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব।

আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ। ছবি: সংগৃহীত

পূর্ব বাংলার ফটোগ্রাফির আরেক পুরোধা ব্যক্তিত্ব আলোকচিত্রাচার্য মঞ্জুর আলম বেগ। তাকে বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পের জনক বলা হয়। ১৯৬০ সালে তিনি বেগার্ট ইন্সটিটিউট অব ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। পরে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি।

এছাড়া বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পের বিকাশে আমানুল হক, নাইব উদ্দিন আহমেদ, ড. নওয়াজেশ আহমেদ, মৃণাল সরকার, সাঈদা খানম, বিজন সরকার, রশিদ তালুকদার, আনোয়ার হোসেন, ড. শহীদুল আলম, মোহাম্মদ আলী সেলিম ও নাসির আলী মামুনসহ আরও অনেক আলোকচিত্রী ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান রেখেছেন।

Image
sayeeda khanam
বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন সাঈদা খানম। ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে ক্যামেরা এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ক্যামেরার বিকাশ ও প্রসারের সঙ্গে আলোকচিত্রেও যুক্ত হয়েছে নানা মাত্রা ও বৈচিত্র্য। কয়েক দশক ধরে পালিত হয়ে আসা বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস এখন সারা বিশ্বের আলোকচিত্রপ্রেমীদের জন্য একটি উৎসবের দিন।

প্রতি বছর ১৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। এই দিবস প্রচলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় আলোকচিত্র শিক্ষক ও. পি. শর্মার নাম।

বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস প্রচলনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে ও. পি. শর্মা অন্যতম। তিনি ১৯৮৮ সালে বিশ্বজুড়ে আলোকচিত্র উদযাপনের জন্য বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস আয়োজনের প্রস্তাব দেন। এ জন্য তিনি বিভিন্ন ফটোগ্রাফি সংস্থা ও আলোকচিত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার প্রচেষ্টায় ১৯৯১ সালে ভারতে প্রথম বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস উদযাপিত হয়। শুরুতে আয়োজনটি সীমিত পর্যায়ে থাকলেও ধীরে ধীরে তা ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

Image
Rashid Talukder
আলোকচিত্রী রশিদ তালুকদার। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস আজ সারা বিশ্বে যে আয়োজনে পরিণত হয়েছে, এর পেছনে অস্ট্রেলিয়ার করস্কে আরা এবং উত্তর আমেরিকার জন মরজেনের অবদানও স্মরণীয়।

১৯ আগস্টের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুই ড্যাগুইরের স্মৃতিও। ১৮৩৯ সালের এই দিনে ফ্রান্স সরকার ড্যাগুয়েরোটাইপ ফটোগ্রাফি প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে আনে এবং এর পেটেন্ট উন্মুক্ত করে দেয়। সেই দিনটিকে স্মরণ করেই প্রতি বছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস উদযাপন করা হয়।

বাংলাদেশেও প্রতিবছর দিনটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। ১৯ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির উদ্যোগে দেশব্যাপী ৮২টিরও বেশি সংগঠনের যৌথ অংশগ্রহণে বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস ২০২৬ উদযাপন করা হবে। দেশের বিভিন্ন আলোকচিত্র সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফটোওয়াক, কর্মশালা, আলোচনা, সেমিনার ও র‍্যালির আয়োজন করা হয়।

Image
Photoghraphy
ফাইল ছবি: রয়টার্স

সব মিলিয়ে বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস শুধু একটি দিবস নয়। এটি নবীন আলোকচিত্রীদের উৎসাহিত হওয়ার দিন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার দিন। এটি বিশ্বের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরার দিন। বিশ্ব সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যকে ছড়িয়ে দেওয়ার দিন। ছবির মাধ্যমে নিজের চিন্তা ও শৈলী প্রকাশের দিন।

এবারের বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসের থিম 'ঘর'। এর মাধ্যমে আলোকচিত্রে ঘরকে জনসম্মুখে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কিন্তু ঘর কি শুধু থাকার জায়গা?

আমেরিকান লেখিকা স্টেফানি পারকিনস ঘরকে শুধু একটি জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ঘরকে তুলনা করেছেন প্রিয় মানুষের সঙ্গে। আসলে একেকজনের কাছে ঘরের সংজ্ঞা একেক রকম। কারও কাছে ঘর প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য, কারও কাছে প্রিয় কোনো কাজ। কারও কাছে ঘর মাথার ওপরের ছাদ, কারও কাছে জীবনসংগ্রাম। আবার কারও ঘর শুধু একটি স্বপ্ন।

আপনার চোখে ঘর কী? সেই উত্তরই হতে পারে আপনার আলোকচিত্রের নতুন ভাষা।