ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি: সাশ্রয়ী সমাধান নাকি ব্যাটারি বর্জ্যের ঝুঁকি
দেশে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশনড বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে নতুন এক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এসব যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিগত কাঠামো দেশে আছে কি না।
পরিবেশগত উদ্বেগ ও অবকাঠামোগত ঘাটতির কথা উল্লেখ করে গত ২৪ আগস্ট ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ অনুযায়ী ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশনড ইভি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানিকারকদের দাবি, নিয়ন্ত্রিত উপায়ে আমদানি করতে দিলে সাধারণ মানুষের কাছে ইভি আরও সাশ্রয়ী হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞ ও এ খাত সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন যে, ব্যবহৃত ইভি ব্যাটারির পরীক্ষা, সংগ্রহ, রিসাইক্লিং ও নষ্ট করে ফেলার মতো ব্যবস্থা এবং স্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান খান জিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রিকন্ডিশনড ইভি আমদানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো ব্যাটারির কার্যমেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলোর ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যখন আপনি একটি ব্যবহৃত ইভি আমদানি করছেন, তখন বাস্তবে আপনি একটি ব্যবহৃত ব্যাটারিও আমদানি করছেন।’
ব্যাটারিগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত ইভি ব্যাটারি সংগ্রহ, রিসাইক্লিং ও নষ্ট করে ফেলার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর অভাব রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও অবকাঠামো ছাড়া আমরা যদি ব্যবহৃত ইভি আমদানি অব্যাহত রাখি, তবে বাংলাদেশ পুরোনো ব্যাটারির ডাম্পিং গ্রাউন্ড বা বর্জ্যের স্তূপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে,’ মন্তব্য করেন অধ্যাপক জিয়া।
তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) যদি রিকন্ডিশনড ইভি আমদানির অনুমতি চায়, তবে ব্যাটারির বর্জ্য সংগ্রহ ও মেয়াদ শেষে সঠিক ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ দায়ভার আমদানিকারকদের নেওয়ার শর্ত দেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু পুরোনো ইভি আমদানি করে সেগুলোর দায় ভোক্তা বা সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।’
তবে সরকার বলছে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং মূলত দেশের প্রস্তুতির ঘাটতিই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া জানান, আমদানি নীতি চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। আলোচনায় দেখা গেছে, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে রিকন্ডিশনড ইভি আমদানি করা এখন বাংলাদেশের জন্য সমীচীন নয়।
তিনি বলেন, ‘দেশে ইভির বহুল ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। চার্জিং স্টেশনের পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক নেই এবং ইভি ব্যাটারি মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের মতো সুযোগ-সুবিধাও কম।’
ইভির ব্যাটারি কীভাবে ফেলে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় ইভির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ব্যাটারি বর্জ্য জমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘এসব সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই নীতিমালায় রিকন্ডিশনড ইভি আমদানিতে কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত নিয়েছে উচ্চপর্যায় থেকে,’ বলেন বড়ুয়া।
একই সময়ে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ ইভিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
তবে বিচিত্র বড়ুয়া জোর দিয়ে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি নীতি প্রণয়ন করলেও রিকন্ডিশনড ইভি শেষ পর্যন্ত দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই মন্ত্রণালয়ের নয়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘রিকন্ডিশনড ইভি আমদানির অনুমতি দেওয়া সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।’
এদিকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছেন আমদানিকারকরা।
গত শনিবার অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশনড ইভি আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায় বারভিডা।
তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর অধীনে এসব গাড়ি আমদানি করা সম্ভব।
সর্বোচ্চ অন্তত পাঁচ বছর পুরোনো ইভি আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বারভিডা। এক্ষেত্রে ব্যাটারির কার্যকারিতা সর্বনিম্ন ৭০ শতাংশ থাকতে হবে এবং ব্যাটারির কার্যমেয়াদের সনদ বাধ্যতামূলক থাকবে।
তবে রিকন্ডিশনড ইভির ব্যাটারির মান ও তথ্যের স্বচ্ছতা যাচাই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির।
তিনি বলেন, ‘সব ইভি ব্যাটারি একরকম নয়। নিকেল-ম্যাঙ্গানিজ-কোবাল্ট, লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট এবং নিকেল-কোবাল্ট-অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানে তৈরি ব্যাটারির বৈশিষ্ট্য ও চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা ভিন্ন হয়ে থাকে।’
কবির জানান, নিকেল-ম্যাঙ্গানিজ-কোবাল্ট ও নিকেল-কোবাল্ট-অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটারির আয়ু তুলনামূলক কম হয়, তবে লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট ব্যাটারি প্রায় তিন হাজার চার্জিং সাইকেল পর্যন্ত চলতে পারে।
উচ্চমানের ব্যাটারির জন্য প্রস্তুতকারকরা আট বছর পর্যন্ত ওয়ারেন্টি দিতে পারে, যেখানে নিম্নমানের ব্যাটারির স্থায়িত্ব অনেক কম হয় বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ব্যবহৃত ইভির ব্যাটারি কত বছরের পুরোনো, সেটির বর্তমান অবস্থা কী এবং আর কতদিন ব্যবহার করা যাবে—এসব স্বাধীনভাবে যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই বলে জানান কবির।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তিন বছরের পুরোনো একটি গাড়ি যদি এমন ব্যাটারি নিয়ে আসে যা এরই মধ্যে কার্যক্ষমতা হারিয়েছে, তবে বাংলাদেশে পৌঁছানোর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেটি অচল হয়ে যেতে পারে।’
উপযুক্ত পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না থাকলে দেশে আমদানি করা ইভি ইলেকট্রনিক বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
কবির আরও বলেন, ‘নিম্নমানের ব্যবহৃত ইভি দেশের বাজারে এলে তা স্থানীয় উৎপাদক ও নতুন ইভি আমদানিকারকদের ক্ষতির মুখে ফেলবে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর থেকে সাধারণ ক্রেতাদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।’
তিনি জানান, তিন বছরের পুরোনো একটি ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ হতে নতুন ব্যাটারির তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়, কারণ এটি আর আগের মতো পুরো শক্তি ধরে রাখতে পারে না।
তবে বারভিডা সভাপতি আবদুল হক বলেন, ‘ব্যাপকভাবে ইভি ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়, তবে এটি রিকন্ডিশনড ইভি আমদানিতে বাধা দেওয়ার কারণ হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য কিংবা পরিবেশ সচেতন নিউজিল্যান্ডের মতো দেশ ব্যাটারির স্বাস্থ্য পরীক্ষার শর্ত সাপেক্ষে রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানির অনুমতি দেয়।’
তার মতে, সরকারের উচিত সরাসরি আমদানি বন্ধ না করে গাড়ির নিরাপত্তা ও ব্যাটারির স্বাস্থ্য যাচাইয়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করা।
ব্যাটারি নষ্ট করে ফেলে দেওয়ার সমস্যা দেখিয়ে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি বন্ধ করার যুক্তিও তিনি নাকচ করেন। তার মতে, ব্যাটারি প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি জাপান থেকে ভালো মানের রিকন্ডিশনড ইভি আমদানি করি, তবে ক্রেতারা সাশ্রয়ী দামে গাড়ি পাবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।’
'বর্তমান বাজারদরে মধ্যবিত্তদের পক্ষে নতুন ইভি কেনা সম্ভব নয়,' বলেন তিনি।


