ইরান যুদ্ধে ব্রিকস দেশগুলোর সম্পর্কে কতটা পরিবর্তন এলো
সপ্তাহের শেষে বিশ্বের কয়েকটি শক্তিশালী দেশের নেতা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একটি বিশাল গোলাকার টেবিল ঘিরে বসেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে ঘোষণা করেন, একসঙ্গে থাকা দেশগুলোর নেতাদের ক্রমেই ‘নিয়ম মেনে চলা দেশ’ না হয়ে ‘নিয়ম নির্ধারণকারী দেশ’ গড়তে হবে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৈঠকে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা।
তবে এসব দেশকে স্বাভাবিক মিত্র বলা কঠিন। তাদের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ থেকে শুরু করে সামরিক সংঘাত পর্যন্ত রয়েছে।
২০২০ সালে বিরোধপূর্ণ সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিপরীত দিকে অবস্থান করেছে। ওই সংঘাতের সময় তেহরান ব্রিকসেরই সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন পরিস্থিতিতে ভারত যে এই নেতাদের একসঙ্গে নয়াদিল্লিতে আনতে পেরেছে, সেটিই তাদের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য এবং দেশটির কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। একইসঙ্গে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগও দিয়েছে।
তবে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করা এবং সেখান থেকে স্পষ্ট ও বাস্তব ফলাফল অর্জন করা অনেক কঠিন।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের সম্মেলনজুড়ে সেই টানাপোড়েনই স্পষ্ট ছিল।
পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা শক্তি
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর জন্য ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব কমানোর একটি মাধ্যম।
তবে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে তুলে ধরতে অনিচ্ছুক। সম্মেলনে মোদিও বলেছেন, এই জোট ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’।
দিল্লির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরস্পরের মধ্যে বিরোধ থাকা দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখতে চায় ভারত।
ভারতের অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াত বিবিসিকে বলেন, ‘এই জোটের কিছু দেশ এটিকে পশ্চিমবিরোধী করতে চায়, কিন্তু এটি তা নয়।’
তার মতে, যুদ্ধের সময় ভারত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের’ দিকে এগিয়েছে এবং নিজেদের মধ্যে আরও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে না দেখানোর ভারতের এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ।
যৌথ ঘোষণায় কী আছে
সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন যখন এতটা স্পষ্ট, তখনো সম্মেলনে একটি যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বিবিসি জানায়, চলতি বছরের শুরুতে ব্রিকসের মন্ত্রী পর্যায়ের দুটি বৈঠক যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। এবার ঐকমত্য হয়েছে। তবে যেসব বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এই ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। ফলে বড় কোনো সমস্যার সমাধানও এতে খুব বেশি নেই।
সম্মেলনের প্রথম দিনেই ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত হয়। তবে ঘোষণায় কী বলা হয়নি, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হলেও কারও বিরুদ্ধে দায় চাপানো হয়নি।
ঘোষণায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করা হয়েছে এবং এমন সব ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে, যা দখলদারিত্বকে বৈধতা দিতে বা দীর্ঘায়িত করতে পারে। তবে এসব বক্তব্য বিদ্যমান জাতিসংঘের প্রস্তাবের কাঠামোর মধ্যেই রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, এ ঘোষণাপত্রে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কোনো উল্লেখই নেই। আগের ব্রিকস ঘোষণাগুলোর তুলনায় এটি একটি বড় পরিবর্তন।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা দেখা গেছে। ঘোষণায় ‘বৈষম্যহীনভাবে বাড়তে থাকা শুল্ক’ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ওয়াশিংটনের বিরাগ এড়ানোর বিষয়টিও এতে স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্ধি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নিন্দা করলেও কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করার বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
তিনি বলেন, শুল্কের বিষয়ে জোরালো বক্তব্য থাকায় তিনি কিছুটা অবাক হয়েছেন। কারণ ভারত চাইলে বিষয়টি আরও পরোক্ষভাবে বলতে পারত। তবে সম্ভবত এটি তাদের অসন্তোষ প্রকাশের একটি সুযোগ ছিল।
সম্মেলনের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঘাতের পর বৈশ্বিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন এখন অনেক ব্রিকস সদস্য দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের সম্মেলন এমন কিছু বৈঠকের সুযোগ তৈরি করেছে, যা কয়েক মাস আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মুখোমুখি বৈঠকে বসেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক।
এই সম্মেলন তেহরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান একা নয়, সেটি দেখানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, ওয়াশিংটনের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ মোকাবিলার পাশাপাশি ব্রিকসের সদস্য মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন পেজেশকিয়ান।
অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর দিল্লি সফর করেছেন। ২০২০ সালের সীমান্ত বিরোধের পর ভারত ও চীনের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই উত্তেজনা কিছুটা কমেছে।
তবে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও রয়েছে, যেখানে ঘাটতির বড় অংশই ভারতের।
শি ও মোদি করমর্দন করেছেন। তবে মোদির স্বভাবসুলভ আলিঙ্গন এবার দেখা যায়নি। শি ২৪ ঘণ্টারও কম সময় দিল্লিতে ছিলেন এবং শনিবার রাতে মোদির দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেননি।
তারপরও দুই দেশের জটিল সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবারের সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, শি ও মোদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পরিবহন যোগাযোগ জোরদার এবং বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক ত্রিগুনায়াতের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উষ্ণ হওয়ার অংশ এটি। দুই পক্ষের মধ্যেই একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে। তবে তা বাস্তবে কতটা অগ্রগতি আনবে, সেটি এখনো দেখার বিষয়।
তার ভাষায়, ‘আমরা সবসময় বলি, আগে বিশ্বাস করতে হবে, তবে তার আগে যাচাই করতে হবে।’
এরপর কী
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ সম্মেলন দেখিয়েছে যে ব্রিকস পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা ও কৌশল নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এরপর কী হবে, সেটিই কঠিন প্রশ্ন।
ব্রিকসের সদস্যরা আগের চেয়ে বেশি একমত যে নতুন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্যবস্থার জায়গায় ঠিক কী আসবে এবং সেখানে পৌঁছানোর পথ কী হবে, তার উত্তর দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।