সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ রাখলে ৬০ শতাংশ বিক্রি কমবে, দাবি ব্যবসায়ীদের
জ্বালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টার পর দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন দেশের খুচরা ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাদের ব্যবসায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ তাদের খুচরা বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশই সন্ধ্যার পর হয়। তাই এই সময়কে ব্যবসায়ের জন্য পিক আওয়ার মনে করেন তারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত তেমন কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্র প্রায় তিন শতাংশ খুচরা ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করেন। আর গরম শুরু হলে এবং তাপমাত্রা বাড়লে সন্ধ্যার তুলনায় দিনে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হয়।
ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, এই সিদ্ধান্তে কেবল বিক্রি কমবে তা নয়, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার গত সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছিল, সারা দেশের দোকান ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত গতকাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
তবে ব্যবসায়ী নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেন, দোকান রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হোক। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গতকাল সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা নির্ধারণ করে।
তবুও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এই উদ্যোগের কারণে তাদের বিক্রির বড় অংশ কমে যাবে এবং এতে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএফ গ্রুপের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামাল বলেন, দিনের বেলা বেশিরভাগ মানুষ কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই কেনাকাটা করেন না। তারা সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত। তাই সন্ধ্যার পরপরই দোকান বন্ধ করলে কেবল ক্রেতাদের সমস্যা হবে তা নয়, ব্যবসায়ীদের বিক্রিও কমে যাবে।
প্রাণ-আরএফএফ গ্রুপ সারা দেশে প্রায় তিনি হাজার আউটলেট পরিচালনা করে এবং এখানে বিপুল সংখ্যক কর্মী কাজ করেন। তাদের ফুল-টাইম ও পার্ট-টাইম উভয় ধরনের কর্মী আছে।
কামরুজ্জামান কামাল বলেন, কাজের সময় কমিয়ে দিলে চাকরির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পার্ট-টাইম কর্মীদের ওপর, যেমন শিক্ষার্থীরা, যারা সন্ধ্যার শিফটের ওপর নির্ভর করে।
এক অনুমান অনুযায়ী, দেশের খুচরা খাতে প্রায় ৮৪ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ কাজ করেন এবং এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ অবদান রাখে। অনেকের জন্য কাজের সময় কমে যাওয়া মানে আয় কমে যাওয়া।
শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, সন্ধ্যার বেচাকেনা কমিয়ে দিলে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আদায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং ফ্যাশন ব্রান্ড কে-ক্রাফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী খালিদ মাহমুদ খান বলেন, দিনের বেলায় বেশি গরমের কারণে দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হয়।
তিনি বলেন, ব্যস্ত সময় (পিক আওয়ারে) দোকান চালানো কমিয়ে দিলে মানুষের কেনাকাটায় সমস্যা হবে, সরকারের কর (ট্যাক্স) আদায় কমবে এবং খুচরা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ট্রান্সকম ইলেকট্রনিক্সের ডিস্ট্রিবিউশন প্রধান সৈকত আজাদ বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘ক্রেতারা ট্রাফিক জ্যাম ও গরম পেরিয়ে যখন কোনো শপিংমলে পৌঁছান, তখন দেখা যায় দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জন্য সময় কমে যাওয়ার মানে সরাসরি বিক্রি কমে যাওয়া, আর এর সঙ্গে ভ্যাট ও কর কমে যাবে।’
সৈকত আজাদ জানান, এখন ক্রেতাদের আচরণও বদলাতে শুরু করেছে।
‘জ্বালানি সংকট ও পরিবহন সমস্যার কারণে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, তাই মানুষ খরচ কমাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা বন্ধ করছে, নতুন কিছু না কিনে পুরোনো জিনিস মেরামত করে ব্যবহার করছে,’ বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, গত ঈদে বিক্রি তেমন ভালো ছিল না। সামনে ঈদুল আজহা, কিন্তু দোকান খোলা রাখার সময় কমে যাওয়া এবং পরিবহন সমস্যার কারণে এই সময়ের বিক্রি আরও কমতে পারে।
তিনি মন্তব্য করেন, ‘এই প্রভাবগুলো আলাদা আলাদা থাকবে না। কারণ এক জায়গায় গতি কমলে অন্য জায়গাতেও তার প্রভাব পড়ে। একদিকে টাকার প্রবাহ কমে গেলে সেটার প্রভাব পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে সামগ্রিক ব্যবসা কমে যায়।’
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর প্রস্তাব করেন, দোকান খোলার সময় পরিবর্তন করে দুপুর ১টা থেকে রাত ৯টা করা যেতে পারে। এতে দুপুরের বেশি গরমের সময় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো যাবে, আবার সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়টাও ঠিক রাখা যাবে।
তিনি বলেন, সব দোকান একসঙ্গে বন্ধ করার বদলে ‘স্মার্টভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা’ করা উচিত। যেমন—এসি ২৫ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রায় চালানো, শপিং মলে অপ্রয়োজনীয় লাইট কমানো, কম বিদ্যুৎ খরচ হয় এমন যন্ত্র ব্যবহার করা এবং দোকানে বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও নিয়ন্ত্রণ আনা।
তিনি জানান, দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের মধ্যে বাণিজ্যিক খাত ব্যবহার করে প্রায় ৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ, আর খুচরা ব্যবসা ব্যবহার করে মাত্র ২ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, ‘এই সামান্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকান আগেভাগে বন্ধ করা হলে অনেক বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।’

