২০২৫ সালে চা উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি কমেছে
বাংলাদেশের চা উৎপাদন ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ০১ শতাংশ বেড়েছে, এমন তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি)।
অনুকূল আবহাওয়া এবং উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি এই উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং রপ্তানিতে মন্দার কারণে শিল্পটি চাপের মধ্যে রয়েছে।
দেশে ২০২৫ সালে ৯৪ দশমিক ৯১ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের উৎপাদনের পরিমাণের চেয়ে ১ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন কেজি বেশি।
বিটিবির সদস্য মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন উৎপাদনের বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পরিমিত বৃষ্টি, চারা বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি, পাতা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সঠিক সার ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।
গত বছর চা উৎপাদন বাড়লেও তা ২০২৩ সালের মতো হয়নি। ওই বছর সর্বোচ্চ ১০২ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল। মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, পুরানো ভূমি ব্যবস্থাপনা, অপ্রত্যাশিত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরতা, সীমিত আধুনিক প্রযুক্তি, দুর্বল সেচ এবং মৌসুমি খরা উৎপাদনকে পিছিয়ে রেখেছে।
‘যদি ভূগর্ভস্থ পানি সময়মতো সেচের জন্য ব্যবহার করা যায়, তাহলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, তবে এমন উদ্যোগের জন্য সীমিত সহায়তা রয়েছে’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস ১৮৪ বছরের। বেশিরভাগ বাগান উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত, অন্যদিকে অন্যান্য উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতেও কয়েক বছর ধরে ক্রমবর্ধমানভাবে চা চাষ শুরু হয়েছে।
স্বনামধন্য ইস্পাহানি গ্রুপের চা বাগানের চিফ অপারেটিং অফিসার গোলাম মোস্তফা বলেন, ২০২৫ সালে চা উৎপাদন সব জায়গায় সমান হয়নি, কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ভিন্ন ছিল।
সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মতো এলাকায় বৃষ্টি অনিয়মিত হওয়ায় কিছু চা বাগানে উৎপাদন কমেছে, যেখানে উত্তরের জেলাগুলোতে উৎপাদন বেড়েছে।
বেঙ্গল চা ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর লুৎফুল কবীর শাহীন বলেন, ২০২৫ সালে চারা বেঁচে থাকার হার বেশি থাকায় উৎপাদন বেড়েছে। তবে উৎপাদনের প্রধান মাসগুলোতে বৃষ্টির অভাবে মোট উৎপাদন আশানুরূপ হয়নি।
শাহীনের মতে, চা গাছের জন্য সময়মতো এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বাঞ্চলে প্রিমিয়াম চা উৎপন্ন হচ্ছে, উত্তরের অঞ্চলগুলো এখনও উন্নয়নশীল। আগামী ৫ থেকে ৭ বছরে সেসব অঞ্চলে উৎপাদন বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে ১৬৯টি চা বাগান আছে, যা দুই লাখ ৮০ হাজার একরের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত্। এর মধ্যে ৯০টি বাগান মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। সেখান থেকে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে। সিলেট অঞ্চলের আরেক জেলা হবিগঞ্জ প্রায় ২২ শতাংশ উৎপাদনে অবদান রাখে।
চা উৎপাদনের শীর্ষ মৌসুম জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চায়ের বার্ষিক চাহিদা বর্তমানে ৮৫ থেকে ৯০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম।
রপ্তানি কমেছে কেন
২০২৫ সালে চা রপ্তানি কমে ১ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন কেজিতে দাঁড়িয়েছে, ২০২৪ সালে যা ছিল ২ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন কেজি।
মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বাংলাদেশি চা বিদেশে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না, বিশেষ করে কেনিয়া ও চীনের সঙ্গে। অর্থোডক্স ও গ্রিন টির মতো প্রিমিয়াম চা বিদেশে সহজে বিক্রি হয়, কিন্তু সাধারণ চা দাম বেশি হওয়ায় রপ্তানি করতে কষ্ট হয়।
শাহীনের মতে, কম উৎপাদন এবং বাড়তে থাকা দেশীয় চাহিদাও রপ্তানি হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে। স্টল ও রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় চায়ের ব্যবহার অন্তত দেড় গুণ বেড়েছে, যা দেশে চায়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
মোস্তফা আরও বলেন, রপ্তানি কমার একটি কারণ হলো নিলামে ২১০ থেকে ২৭০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত ফ্লোর প্রাইস, যা ক্রেতাদের অংশগ্রহণ সীমিত করে।
শীর্ষস্থানীয় চা কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, বাজারে চোরাচালান কম হওয়ায় চায়ের স্থানীয় চাহিদা বেড়েছে। ফলে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গড় নিলাম মূল্য ৪০ টাকা বেড়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি রপ্তানির তুলনায় আরও লাভজনক হয়েছে।
বাংলাদেশ চা অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কামরান তানভীরুর রহমান বলেন, উৎপাদন ও দাম কিছুটা বেড়েছে, তবুও দেশের চা শিল্প এখনও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে।
তিনি বলেন, সামান্য উৎপাদন বৃদ্ধি চা বাগানের আর্থিক সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। ফ্লোর প্রাইস দাম কিছুটা বাড়িয়েছে, কিন্তু অনেক চা এখনো বিক্রি হয়নি কিংবা লোকসানে বিক্রি হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের বিষয়টি তুলে ধরে রহমান বলেন, 'জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার এবং শ্রমের মূল্য বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ ক্রমেই বেড়ে চলছে।' বেতন ও পরিচালন খরচও বেড়েছে, কিন্তু চায়ের দাম ততটা বাড়েনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, 'যদি চায়ের দাম আরও না বেড়ে, চা বাগানগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।' লাভ নিশ্চিত করতে তিনি স্থায়ী মূল্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
রহমান বলেন, দেশের চা উৎপাদন ১৯৭২ সালে প্রায় ৩০ মিলিয়ন কেজি থেকে ২০২৩ সালে ১০২ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত হয়েছে। আগে উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি রপ্তানি হতো, কিন্তু গত ৮ থেকে ১০ বছরে দেশীয় চাহিদা বাড়ার কারণে রপ্তানি কমেছে। এখন দেশের বেশিরভাগ চা দেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশে চাহিদা বাড়ায় রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমেছে, তবে 'এখন চা শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে।' এই অতিরিক্ত চায়ের জন্য রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ শিল্পের জন্য লাভজনক হতে পারে।