যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: শর্তের বেড়াজালে পড়বে বাংলাদেশ?
অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সমালোচকরা চুক্তির বেশ কিছু বাধ্যতামূলক ও শর্তযুক্ত ধারার দিকে আঙুল তুলেছেন। এসব ধারা অনুযায়ী ওয়াশিংটন যেকোনো সময় চুক্তি বাতিল করে পুরোনো শুল্কহার ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে, যদি না তাদের উদ্বেগ নিরসন হয়।
উদাহরণ হিসেবে ডিজিটাল বাণিজ্য সুবিধা-সংক্রান্ত ধারাটির কথা বলা যেতে পারে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, তবে ওয়াশিংটন এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যে আবারও ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্কহার প্রস্তাব করেছিল।
একই শর্ত প্রযোজ্য হবে যদি বাংলাদেশ এমন কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি করে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ বা বাজার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় সমাধান না হলে ওয়াশিংটন চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে এবং পুনরায় ৩৭ শতাংশ শুল্ক বহাল করতে পারবে।
এই উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। কারণ, তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে আয় করে, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে এমন একটি ধারাও রয়েছে, যা বাংলাদেশকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী’ কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনায় বাধা দেবে।
তবে একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি বিকল্প কোনো সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি না থাকে অথবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই বিদ্যমান চুল্লির জন্য উপকরণ কেনার চুক্তি হয়ে থাকে, তবে তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।
এর মানে হলো, রাশিয়ার প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যতের কোনো পারমাণবিক প্রকল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর থাকবে।
অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ধারাটি উদ্ধৃত করে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এটি চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অংশ, কারণ এখানে “সার্বভৌমত্ব” নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’
ওই ধারায় আরও বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর ও উন্নত করতে কাজ করবে।’ পারমাণবিক বিধিনিষেধের বিষয়ে আসিফ সালেহ বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিনিয়োগের দুয়ারও খোলা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি করতে পারবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ টন গম এবং অন্তত ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ টন সয়া ও সয়াজাত পণ্য এবং তুলা।
পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপরও সীমা আরোপ করা হয়েছে।
আসিফ সালেহ বলেন, ‘এটি মুক্ত বাণিজ্যের চেয়ে বরং চাপিয়ে দেওয়া কেনাকাটার বাধ্যবাধকতা বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রকৃত প্রয়োজন বা সক্ষমতা যা-ই হোক না কেন, এটি কার্যত মার্কিন কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিশ্চিত করছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত সরকারিভাবে নয়, বরং বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরাই ভোগ্যপণ্য আমদানি করেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ব্যবসায়ীরা যদি অন্য কোথাও কম দামে পণ্য পান, তবে কেন তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনবেন?
সে ক্ষেত্রে সরকারকে হয়তো বেসরকারি আমদানিকারকদের মার্কিন পণ্য কিনতে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দিতে হবে, যা রাজস্বের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
গত সপ্তাহে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, সস্তা বিকল্প থাকার পরও বাংলাদেশকে হয়তো চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি অন্য কোথাও সস্তায় পাই, তবু হয়তো তা নিতে পারব না। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।’
উড়োজাহাজ কেনা ও জ্বালানি আমদানির অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, এই চুক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
চুক্তিতে ‘রুলস অব অরিজিন’ বা পণ্যের উৎসের নিয়মসংক্রান্ত একটি ধারাও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি চুক্তির সুবিধা তৃতীয় কোনো দেশ বা তাদের নাগরিকদের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে চলে যায়, তবে যেকোনো পক্ষ চুক্তির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে রুলস অব অরিজিন নির্ধারণ করতে পারবে।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, তৃতীয় দেশের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত ছিল।
গোপনীয়তার শর্ত দেখিয়ে চুক্তিটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মুখে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা চুক্তিতে একটি ‘এক্সিট ক্লজ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার ধারা যুক্ত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোনো দেশের পক্ষেই চুক্তি বাতিলের সুযোগ ছিল না।’ তবে চুক্তি বাতিল হলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে আবার ৩৭ শতাংশ হবে কি না, সে বিষয়ে বিবৃতিতে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।