মৃত্যুর পর আপনার ডিজিটাল জীবনের কী হবে?

আরিফ হোসেন
আরিফ হোসেন

একজন মানুষের মৃত্যু হলে তার বাড়ি, জমি, ব্যাংক হিসাব, গয়না কিংবা অন্যান্য দৃশ্যমান সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবার ভাবতে শুরু করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের আরেকটা জীবন রয়েছে—ডিজিটাল জীবন। সেখানে জমা থাকে বছরের পর বছর ধরে তোলা ছবি, কথোপকথন, নথি, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্মৃতি, অনলাইন ব্যবসা, ওয়েবসাইট এবং কখনো অর্থমূল্যসম্পন্ন ডিজিটাল সম্পদ।

কিন্তু মানুষটি মারা যাওয়ার পর এসবের কী হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর অনেক পরিবারের কাছেই অজানা। ফলে প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি তাদের পড়তে হয় ডিজিটাল জটিলতায়। কারও ফোনের পাসকোড জানা নেই, ই-মেইলে ঢোকা যাচ্ছে না, ব্যবসার ফেসবুক পেজে আর কোনো অ্যাডমিন নেই কিংবা ক্লাউডে সংরক্ষিত অসংখ্য পারিবারিক ছবি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।

মৃত্যুর পরও থেকে যায় আমাদের ডিজিটাল ছায়া

বর্তমানে একজন সাধারণ মানুষেরও অসংখ্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল, গুগল ড্রাইভ, গুগল ফটোস, ইউটিউব, আইক্লাউড, ওয়ানড্রাইভ, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, বিকাশ বা ব্যাংকিং অ্যাপ, ই-কমার্স অ্যাকাউন্ট, ডোমেইন, ওয়েব হোস্টিং এবং বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন।

এসব অ্যাকাউন্টের কিছু শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ, আবার কিছু পরিবারের জন্য আর্থিক ও আইনি গুরুত্ব বহন করতে পারে। একজন ফটোগ্রাফারের ক্লাউডে হয়তো তার সারাজীবনের কাজ সংরক্ষিত। একজন লেখকের ই-মেইলে থাকতে পারে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট ও গ্রাহকের তথ্য।

আগাম ব্যবস্থা না থাকলে এসব সম্পদ উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কী হয়?

কোনো ব্যবহারকারীর মৃত্যুর প্রমাণ পেলে ফেসবুক তার অ্যাকাউন্টকে মেমোরিয়ালাইজড অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করতে পারে। তখন প্রোফাইলটি বন্ধু ও পরিবারের জন্য স্মৃতিচারণের জায়গা হিসেবে থেকে যায়। তবে এতে আর কেউ সাধারণভাবে লগইন করতে পারে না। 

ব্যবহারকারী আগে থেকে একজন ‘লিগ্যাসি কনট্যাক্ট’ নির্বাচন করে রাখলে সেই ব্যক্তি সীমিত কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যেমন প্রোফাইল ও কভার ছবি পরিবর্তন করা, স্মরণবার্তা পরিচালনা করা বা অ্যাকাউন্ট বন্ধের অনুরোধ করা। তবে তিনি ব্যক্তিগত মেসেজ পড়তে পারেন না।

ব্যবহারকারী জীবিত অবস্থায় চাইলে মৃত্যুর পর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার সিদ্ধান্তও দিয়ে রাখতে পারেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, কোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ যদি শুধু একজন ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে পরিচালিত হয়, তার মৃত্যুর পর পেজটি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফেসবুকের তথ্য অনুযায়ী, একমাত্র অ্যাডমিনের অ্যাকাউন্ট মেমোরিয়ালাইজড হলে বৈধ অনুরোধ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পেজ অপসারণ করা হতে পারে।

তাই ব্যবসায়িক পেজে অন্তত দুজন বিশ্বস্ত অ্যাডমিন রাখা প্রয়োজন।

জিমেইল, গুগল ড্রাইভ ও ছবিগুলোর কী হবে?

গুগল ব্যবহারকারীদের জন্য ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’ নামে একটি সুবিধা রেখেছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী ঠিক করতে পারেন, দীর্ঘ সময় তার অ্যাকাউন্টে কোনো কার্যক্রম না থাকলে কী ঘটবে।

তিনি কিছু বিষয় নির্ধারণ করে রাখতে পারেন। যেমন কত দিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট তথ্য শেয়ার করা হবে এবং অ্যাকাউন্টটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলা হবে কি না।

অর্থাৎ ব্যবহারকারী চাইলে বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তিকে তার জিমেইল, গুগল ড্রাইভ, ফটোস কিংবা নির্বাচিত অন্যান্য তথ্য পাওয়ার সুযোগ দিয়ে যেতে পারেন। 

গুগল নিজেও বলছে, মৃত্যুর পর তথ্য কার কাছে যাবে বা অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হবে কি না, সেটি আগেই নির্ধারণের সর্বোত্তম উপায় হলো ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’।

আগে থেকে এই ব্যবস্থা না থাকলে পরিবারের সদস্যরা গুগলের কাছে আবেদন করতে পারেন। তবে আবেদন করলেই যে অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আইন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিবেচনা করে গুগল প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে।

আইফোন ও আইক্লাউডের তথ্য কি পরিবার পাবে?

অ্যাপল ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে ‘লিগেসি কনট্যাক্ট’ সুবিধা। এর মাধ্যমে জীবিত অবস্থায় এক বা একাধিক বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যায়, যারা ব্যবহারকারীর মৃত্যুর পর অ্যাপল অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন।

এ জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিকে একটি বিশেষ অ্যাকসেস-কি দেওয়া হয়। মৃত্যুর পর অ্যাকসেস-কি ও মৃত্যু সনদসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে তিনি আবেদন করতে পারেন। অনুমোদন পেলে ছবি, নোট, ফাইল ও অন্যান্য নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। 

অ্যাপলের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর পর বিশ্বস্ত কারও জন্য তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করার সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ পদ্ধতি হলো লিগেসি কনট্যাক্ট।

তবে সব তথ্য উত্তরাধিকারীর কাছে যায় না। অর্থ পরিশোধের তথ্য, পাসওয়ার্ড বা কিছু লাইসেন্স করা ডিজিটাল কনটেন্ট আলাদা নিয়মের অধীন থাকতে পারে।

পাসওয়ার্ড লিখে রেখে যাওয়াই কি সমাধান?

অনেকে মনে করেন, একটি কাগজে সব পাসওয়ার্ড লিখে রেখে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু এটি নিরাপদ পদ্ধতি নয়।

কারণ পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হতে পারে, কাগজটি অন্যের হাতে পড়তে পারে কিংবা দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তার কোড ছাড়া শুধু পাসওয়ার্ড দিয়েও অ্যাকাউন্টে ঢোকা সম্ভব নাও হতে পারে। আবার কারও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে মৃত্যুর পর তার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা কিংবা স্থানীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তাই মূল পাসওয়ার্ড প্রকাশ না করে নিরাপদ পাসওয়ার্ড ম্যানেজার, জরুরি প্রবেশাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের লিগ্যাসি সুবিধা ব্যবহার করাই ভালো।

ডিজিটাল সম্পদ মানে শুধু ছবি ও ফেসবুক নয়

ডিজিটাল উত্তরাধিকারের মধ্যে অর্থমূল্যসম্পন্ন সম্পদও থাকতে পারে। যেমন ডোমেইন ও ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, আয় করা ফেসবুক পেজ, অনলাইন ব্যবসা, পেইড সফটওয়্যার, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, অনলাইন কোর্স, ই-বুক, রয়্যালটি আয় এবং বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট।

ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের ডোমেইন শুধু মালিকের ব্যক্তিগত ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করা। তার আকস্মিক মৃত্যু হলে ডোমেইন নবায়নের নোটিশ আর কেউ দেখতে পাবে না। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও ই-মেইল দুটিই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আবার একটি ইউটিউব চ্যানেল বা অনলাইন ব্যবসা নিয়মিত আয় করলেও উত্তরাধিকারীরা হয়তো জানেনই না, সেটি কোন ই-মেইল, ফোন নম্বর বা ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত।

ডিজিটাল উইল কেন প্রয়োজন?

আমরা সম্পত্তির জন্য উইল করার কথা জানি। একইভাবে এখন প্রয়োজন ডিজিটাল উইল বা ডিজিটাল উত্তরাধিকার পরিকল্পনা।

এটি প্রচলিত উইলের বিকল্প নয়। বরং এতে উল্লেখ থাকবে আপনার কী কী গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট রয়েছে, কোনটি সংরক্ষণ করতে হবে, কোনটি মুছে ফেলতে হবে, ব্যক্তিগত ছবি ও নথি কার কাছে যাবে, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট কে পরিচালনা করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইল কোথায় সংরক্ষিত।

এখানে পাসওয়ার্ড সরাসরি লিখে না রেখে পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের জরুরি প্রবেশপদ্ধতি বা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রাখা যেতে পারে। অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য থেকে সাধারণ পারিবারিক ছবি—সবকিছুর ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার নেই। কোন তথ্য পরিবার পাবে এবং কোনটি আপনার সঙ্গেই মুছে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনারই।

এখনই যে কাজগুলো করা উচিত

প্রথমে নিজের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অ্যাকাউন্টগুলোর একটি তালিকা তৈরি করুন। এরপর ফেসবুকের লিগেসি কনট্যাক্ট, গুগলের ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার এবং অ্যাপলের লিগেসি কনট্যাক্ট চালু করুন।

ব্যবসায়িক পেজ, ডোমেইন, ওয়েবসাইট ও ক্লাউড স্টোরেজে বিকল্প দায়িত্বশীল ব্যক্তি যুক্ত করুন। গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ছবি ও নথির অন্তত দুটি ব্যাকআপ রাখুন। পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করুন এবং পরিবারের বিশ্বস্ত একজন সদস্যকে জানান, জরুরি নির্দেশনাগুলো কোথায় রাখা আছে।

ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার ও নমিনি নীতিমালা অনুসরণ করুন। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর সহায়তায় আনুষ্ঠানিক উইলে ডিজিটাল সম্পদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করুন।

শেষ লগআউটের আগেই সিদ্ধান্ত নিন

মৃত্যু নিয়ে পরিকল্পনা করা অস্বস্তিকর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শারীরিক জীবনের মতো ডিজিটাল জীবনেরও একটি সমাপ্তি রয়েছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু—মানুষ চলে গেলেও তার ছবি, লেখা, মেসেজ, কণ্ঠস্বর এবং অনলাইন পরিচয় বছরের পর বছর রয়ে যেতে পারে।

সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে সেই ডিজিটাল স্মৃতিগুলো পরিবারকে যেমন আবেগের মধ্যে ফেলতে পারে, তেমনি সৃষ্টি করতে পারে আর্থিক ক্ষতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ও দীর্ঘ আইনি জটিলতা।

তাই বাড়ি, জমি ও ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি নিজের ডিজিটাল জীবনের উত্তরাধিকার নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ আপনার শেষ লগআউটের পরও ইন্টারনেটে আপনার একটি জীবন থেকে যাবে। প্রশ্ন হলো—সেই জীবনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?