পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের কী হবে?
যৌক্তিকতা আর ন্যায্যতা এক নয়। নতুন পে-স্কেল প্রথম পরীক্ষাটি পার করলেও দ্বিতীয়টি পারেনি। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যেন দুটি মেরু তৈরি হয়েছে। একটি গোষ্ঠী সরকারি আদেশের মাধ্যমে গত এক দশকে হারানো ক্রয়ক্ষমতা এক ধাক্কায় ফেরত পাচ্ছে। অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ যারা এখনও অপেক্ষা করছেন। দিন গুণছেন কবে তাদের আয়ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়বে।
তবে বেতনের এতখানি উল্লম্ফন, সরকারি চাকরিজীবী আর জনগণের আয়ের মধ্যকার ফারাককে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সমস্যা বেতন বাড়ানোতে নয়। সমস্যা হলো, এই সুবিধা পাচ্ছেন তুলনামূলকভাবে ছোট একটি গোষ্ঠী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, প্রায় চার বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি মজুরিকে ছাড়িয়ে থেকেছে। অর্থাৎ আয় বাড়ছে ধীরে, দাম বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত।
তবে পে-স্কেলের হিসাবটা একটু পেছনে তাকালে আরও পরিষ্কার হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম বেতন পাওয়া সরকারি কর্মচারীর মাসিক বেতন ছিল ১৩০ টাকা। আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পেতেন ২ হাজার টাকা। সোমবার নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর এখন এই দুটি বেতন দাঁড়াবে যথাক্রমে ২০ হাজার টাকা ও ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকে সর্বনিম্ন সরকারি বেতন বেড়েছে ১৫৩ গুণ। আর সর্বোচ্চ বেতন বেড়েছে ৭৮ গুণ। অথচ যে অর্থনীতিকে এসব সরকারি কর্মকর্তা পরিচালনা করছেন, সেই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৬২ গুণ। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৭ গুণ।
হিসাবের খাতায় দেখলে, সর্বনিম্ন সরকারি বেতন বেড়েছে গড় নাগরিকের আয়ের চেয়েও অনেক বেশি, প্রায় ছয়গুণ। অথচ এই বেতন বাড়ানোর অর্থের জোগান দিচ্ছেন সেই সাধারণ নাগরিকরাই।
ন্যায্যতার কথা বলতে গেলে, সরকারি কর্মীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। ২০১৫ সালের পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটাও ছিল ১০ বছর আগে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি অনেক সময়ই ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপ পড়েছে বেশি।
পুরোনো বেতন কাঠামোয় থাকা সরকারি কর্মীরাও বছরের পর বছর তাদের প্রকৃত আয় কমতে দেখেছেন। সরকারের যুক্তি হলো, এই বেতন বৃদ্ধি মূলত দীর্ঘদিনের বকেয়ার সমন্বয়। সেই যুক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে গ্রেডভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট ‘অভিজাত বনাম সাধারণ’ বৈষম্য ফুটে ওঠে। ১ম থেকে ১১তম গ্রেডের পদগুলোতে প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১২তম গ্রেড থেকে নিচের দিকে বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ২০তম গ্রেডে, ১৪২ শতাংশ।
শতাংশের হিসাবে দেখলে বিষয়টা বেশ ভালোই মনে হয়। মনে হতে পারে, নিচের দিকের কর্মীরাই বেশি সুবিধা পেয়েছেন। কিন্তু টাকার অঙ্কে হিসাব করলে চিত্রটা বদলে যায়।
১ম গ্রেডের একজন সচিবের বেতন বাড়ছে এক ধাক্কায় ৭৮ হাজার টাকা। অথচ ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের জুনিয়র কর্মীদের ক্ষেত্রে শতাংশের হিসাবে বড় বৃদ্ধি হলেও প্রকৃত বেতন বাড়ছে ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে।
এমন সময়ে এই বেতন বাড়ানো হচ্ছে, যখন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি খুব একটা স্বস্তিতে নেই। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সরাসরি সতর্ক করেছে। সংস্থাটি বলেছে, নিম্নআয়ের মানুষের আয় পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। একই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে ও দারিদ্র্য বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির মাঝখানেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে একটি গোষ্ঠীর আয় এক ধাক্কায় বাড়ছে। অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, দেশের বাকি মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন।
এর সঙ্গে দেশের দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসা কাঠামোগত আয়বৈষম্যের বিষয়টাও যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বোঝার একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক গিনি সহগ। এই সূচকে শূন্য মানে পুরোপুরি সমতা, আর এক মানে পুরোপুরি আয়কেন্দ্রিক বৈষম্য।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের গিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৩৬। ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৫০ হয়েছে। এখন দেশের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশের মতোই চলে যায় সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। আর ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সম্পদের এক-চতুর্থাংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে।
সরকারি কর্মীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রয়োজনীয় হলেও দেশের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রয়োজনকে এতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই এটি যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু সবার জন্য সমানভাবে ন্যায্য বলা কঠিন।
মূলত করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে রাষ্ট্র তার নিজস্ব প্রশাসনিক শ্রেণিকে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দিচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষের আয় বাজারে যতটা বাড়ছে, সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি তার চেয়ে অনেক বেশি।
এখানেই মূল সমস্যাটা। সরকারি খাতে বেতন নির্ধারিত হয় সরকারের সিদ্ধান্তে, তাও সাধারণত বড় ব্যবধানে, প্রায় এক দশক পরপর। অন্যদিকে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বেতন নির্ভর করে বাজার পরিস্থিতি ও কর্মীদের দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর। সেখানে বেতন বাড়ে অল্প অল্প করে। আর এই মুহূর্তে সেই সামান্য বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতিকে ছুঁতে পারছে না।
ফলে একটি ব্যবস্থায় একবারে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি হচ্ছে, যা আগের বহু বছরের ক্ষতি একসঙ্গে পুষিয়ে দিচ্ছে। আর অন্য ব্যবস্থায় মানুষের আয় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, অথচ সেই ক্ষতি ঠেকানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
এমনকি নতুন পে-স্কেলের পক্ষের লোকজনও স্বীকার করছেন, এতে সরকারের কোষাগারে বড় চাপ পড়বে। অর্থ মন্ত্রণালয় ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এর অর্থ হলো, একসঙ্গে সরকারি বেতন বাবদ ব্যয় দ্বিগুণ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা সরকারের নেই।
পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে প্রতি বছর সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। অথচ এমনিতেই বাজেট বড় চাপের মধ্যে আছে। কর আদায় দুর্বল, ব্যাংক খাত চাপে রয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি নেই এবং জ্বালানি ব্যয়ও বেশি।
এই নাজুক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর প্রতিবছর আরও বড় ও স্থায়ী ব্যয়ের বোঝা চাপলে সরকারকে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এই চাপ সামলাতে যদি সরকার বেশি ঋণ নেয়, পরোক্ষ কর বাড়ায় কিংবা ভর্তুকি কমায়, শেষ পর্যন্ত সেই খরচের বোঝা গিয়ে পড়বে নিম্নআয়ের মানুষের ওপরই, যারা এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা।
যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির ব্যাপারে আমাদের সাবধান থাকার কথা, এই নতুন পে-স্কেল সেগুলোই আরও বাড়িয়ে তুলবে।


