বিশ্লেষণ

গাজা যুদ্ধের ১ হাজার দিন: ধ্বংস, মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের শেষ কোথায়?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস নেতৃত্বাধীন হামলার পর তেল আবিবের পাল্টা অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ বৃহস্পতিবার এক হাজার দিনে পৌঁছেছে। এই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা কার্যত পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের একটিতে, আর ইসরায়েলে জোরালো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যর্থতার তদন্তের দাবি।

আল জাজিরা, এএফপি এবং গাজার সরকারি ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৭৩ হাজার ৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন।

অন্যদিকে ইসরায়েলি তথ্যভিত্তিক হিসাব বলছে, ৭ অক্টোবরের হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।

গাজার ৯০ শতাংশ ধ্বংস, ৮০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকার ৯০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থল অভিযান, সামরিক অভিযান এবং জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনার মাধ্যমে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বুধবার ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, ইসরায়েল বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এই নিয়ন্ত্রণ ‘১০০ শতাংশে’ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই মন্তব্যের পর হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম আরব লীগের জরুরি সম্মেলন আহ্বানের দাবি জানান। তার ভাষায়, ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং বিশেষ করে মিশরসহ অন্যান্য আরব দেশের জন্যও হুমকি।

নির্বিচার বোমা হামলায় গাজাকে কার্যত গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

হিরোশিমার চেয়েও বহুগুণ বেশি বিস্ফোরক

গাজার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে উপত্যকাটিতে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার টন বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, এটি ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরক শক্তির প্রায় ১৬ গুণ।

গাজায় নিহতদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার ৫০০ শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে ১ হাজার ২২ জন নবজাতক। আরও প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ; অনেকের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।

এ ছাড়া, ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬২ জন সাংবাদিক, ১৪৫ জন সিভিল ডিফেন্স সদস্য এবং ৯২৮ জন ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ।

খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় নিহত এক কিশোরের মরদেহ নিয়ে স্বজনদের আহাজারি। ছবি: এএফপি

যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি মৃত্যু

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর বড় আকারের হামলা কমলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১ হাজার ৫৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৫০ জনের বেশি নারী ও শিশু। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, একই সময়ের মধ্যে তাদের পাঁচ সেনা ও একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘ বুধবার সতর্ক করে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ বেসামরিক মানুষের জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্পষ্ট সীমারেখা নেই।

খান ইউনিসের একটি দাতব্যকেন্দ্র থেকে বিতরণ করা খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। ছবি: এএফপি

অবরোধে হাসপাতাল, দুর্ভিক্ষের শঙ্কা

গাজার সব সীমান্তপথ এখনও ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিংবা বন্ধ। ফলে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জাতিসংঘ গত মাসে জানায়, মৌলিক সরঞ্জামের অভাবে গাজার ১৭টি হাসপাতাল এখনও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গত বছরের আগস্টে গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছিলেন।

তবে গাজায় বেসামরিক কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সংস্থা কোগাট দাবি করেছে, গাজায় প্রবেশ করা খাদ্যের পরিমাণ স্থানীয় জনগণের পুষ্টিগত চাহিদার চেয়েও বেশি।

অন্যদিকে, গাজার লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনও বিশাল তাঁবুশিবিরে কিংবা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছেন। অনেক ফিলিস্তিনির ভাষ্য, এক হাজার দিনের যুদ্ধ তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার সব সীমা অতিক্রম করেছে।

হামাসের হামলার এক হাজার দিন পূর্তি উপলক্ষে জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের বাইরে সরকার ও গাজা যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়ায় পুলিশ। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলে শোক, বিক্ষোভ ও তদন্তের দাবি

যুদ্ধের এক হাজারতম দিনে ইসরায়েলজুড়েও স্মরণসভা, পদযাত্রা, বিক্ষোভ ও এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়েছে।

প্রথম অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ৬টা ২৯ মিনিটে—ঠিক যে সময়ে ২০২৩ সালের হামলা শুরু হয়েছিল।

নিহতদের স্বজন, বেঁচে ফেরা ব্যক্তি ও সাবেক জিম্মিদের নিয়ে গঠিত ‘অক্টোবর কাউন্সিল’ ছিল কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক।

তাদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘পরিত্যাগ, অবহেলা, ধামাচাপা ও ব্যর্থতার এক হাজার দিন।’

সংগঠনটি বলেছে, ‘জিম্মিদের পরিবার ও নিহতদের স্বজনেরা এখনই রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছেন।’

জনমত জরিপগুলোও দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনের পক্ষে।

তবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এখনও এমন কমিশন গঠনে রাজি হয়নি।

ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির সোমবার বলেন, ‘এই দিনটি আমাদের সামগ্রিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা স্মরণ করি, শিখি এবং সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুতি নিই।’

গাজার সীমান্তবর্তী এলাকায় মোতায়েন ইসরায়েলি সাঁজোয়া ক্যাটারপিলার ডি-৯ বুলডোজার চলাচল করছে। ছবি: রয়টার্স

গাজার সীমান্ত এলাকায় ফিরছে ইসরায়েলিরা

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের এক হাজার দিন পূর্তিতে গাজার সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে আরও পাঁচ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপন করেছেন।

হামলার আগে ওই এলাকায় প্রায় ৬২ হাজার ইসরায়েলির বসবাস ছিল। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা ফিরে এসেছেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষের বসবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ইসরায়েলি সরকার।

ইসরায়েলের টেকুমা ডিরেক্টরেট জানিয়েছে, সীমান্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের জন্য এক হাজারের বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা জোরদার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কৃষিখাতে বিনিয়োগ এবং শিল্পকারখানা স্থানান্তরে প্রণোদনা।

মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলের দিকে তাকিয়ে আছেন এক নারী। ছবি: এএফপি

এক হাজার দিনের শেষেও প্রশ্ন রয়ে গেছে

এক হাজার দিনের যুদ্ধের পরও গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বন্দিদের মুক্তি, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান—কোনো বিষয়েই এখনও স্পষ্ট অগ্রগতি নেই।

ধ্বংসস্তূপ, মানবিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সমাপ্তি কবে ঘটবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।