ট্রাম্প কি ইসরায়েলের ‘স্বপ্ন’ ভেঙে দিলেন?
ইরানকে করায়ত্ত করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টা আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের ‘স্বপ্ন’ ভেঙে গেল কি?
খনিজসমৃদ্ধ ইরানের সঙ্গে মহাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের শেষ পরিণতি বিশ্ববাসী দেখছে। এর মধ্য দিয়ে কি তেল আবিবেরই ‘স্বপ্নভঙ্গ’ বাস্তব রূপ পাচ্ছে?
মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পুরাকালের ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তেল আবিব গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বেশ বেপরোয়া আচরণ করে আসছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসের রক্তক্ষয়ী হামলার পর ইসরায়েল সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবরুদ্ধ গাজায় গণহত্যা চালায়। অধিকৃত পশ্চিমতীরে জাতিগত নির্মূল অভিযান আরও জোরদার করে।
শুধু তাই নয়—প্রতিবেশী লেবানন, সিরিয়া ও সর্বোপরি ইরানে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরায়েলি বাহিনী। উদ্দেশ্য—তেল আবিবকে নিরাপদ রাখা।
তবে গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সাফল্য না পাওয়ায় দেশটির প্রধান মিত্র ইসরায়েলকেও যেন পরাজয় মেনে নিয়ে আপাতত চুপ থাকতে হচ্ছে। কেননা, জেনেভায় শান্তি আলোচনার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আচমকা ইরানে হামলা চালিয়েছিল।
সব আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশের তকমাধারী ইসরায়েল পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইরানের ওপর কোনো উসকানি ছাড়াই যেভাবে হামলা চালিয়েছিল তাতে অনেকেই তেহরানের শাসকদের পতন অবশ্যম্ভাবীই ভেবেছিলেন। কিন্তু, বিধি যেন বাম!
দেখা গেল—তিন মাসের মধ্যেই ইরান প্রসঙ্গে উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন ডিসি। আর একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে প্রধান মিত্র তেল আবিবকে।
গতকাল ১৭ জুন লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এ ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের ‘ইউ টার্ন’ ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ‘স্বপ্ন’ নিয়ে এক বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়।
সংবাদমাধ্যমটির প্রধান সম্পাদক ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড হার্স্ট বিশ্লেষণটিতে বলেন—আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেসব দেশের শাসক বদলাতে পারলেও, এ যাত্রায় ইরানের ক্ষমতাসীনরা টিকে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলা শুধু দেশটির শাসক বদলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বলেও এতে মন্তব্য করা হয়।
তার মতে—‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মতো করে সাজানোর পরিকল্পনা ছিল ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের। ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে তার বহুল আলোচিত ‘অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।
খোলা চোখে দেখলে দেখা যায়, তার সব প্রচেষ্টা যেন ভেস্তে গেছে।
কেননা, ইরানের সঙ্গে এমন ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সইয়ের সময় হোয়াইট হাউস বা ওভাল অফিসের পাদপ্রদীপের নিচে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সঙ্গে ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দেখা গেল না।
বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্ট মনে করেন—নেতানিয়াহুর সঙ্গে ইরান যুদ্ধে যোগ দিয়ে ট্রাম্প যেন নিজেই বিপদেই পড়েছেন। সেই বিপদ এতটাই গভীর যে সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য তিনি বন্ধু নেতানিয়াহুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেননি। এমনকি, ইরানের সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা হতে যাচ্ছে যে বিষয়ে তাকে কিছু জানাননি।
হার্স্টের ভাষ্য: ইরানে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ‘ইউ টার্ন’ নেতানিয়াহুর জন্য এক বিপর্যয়।
এই বিপর্যয় আরও কয়েক প্রজন্ম ধরে বয়ে বেড়াতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। মার্কিনিদের কাছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বকালের সর্বনিম্ন। নিজের রিপাবলিকান পার্টির খাস লোকেরাও তার বিরোধিতায় নেমেছে। এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি প্রায় থমকে গিয়েছে।
ট্রাম্পপন্থি ব্যবসায়ীদের পকেটে টান পড়ায় আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধ সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের ভরাডুবির পূর্বাভাসও দিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়—ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের বিজয়গাথা সুদূর পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে ভয়াবহভাবে আটকে যেতে দেখা গেছে। তাই যেন ইরান যুদ্ধ নিয়ে ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পের মানসিক দ্বন্দ্ব এক নতুন উচ্চতায় উঠেছিল।
ইসরায়েলের চ্যানেল থার্টিন-এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালোন বেন ডেভিড মনে করেন, ‘গণেশ’ উল্টে গেছে। এক সময় ধারণা করা হতো যুক্তরাষ্ট্রের বদান্যতায় ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে। কিন্তু, ইরান যুদ্ধের বাস্তবতায় দেখা গেল—মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
অপর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর সামরিক বিশ্লেষক অ্যামোস হ্যারেলের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর ট্রাম্পের ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থিরা এখন ইসরায়েলকে ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণে উৎসাহ দিচ্ছে। তবে ট্রাম্প সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব ‘বিপন্ন’ হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষণটি থেকে আরও জানা যায়—যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি লবি এখন মার্কিন কংগ্রেসে এমন আইন আনার চেষ্টা করছে যার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের সময় ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয় নিশ্চিত করা যাবে।
মার্কিন প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েল তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়ত অব্যাহত রাখবে। তবে আপাতত এটা বলা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে নিয়ে নেতানিয়াহু তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সকে নিয়েও তেল আবিব নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারছে না বলেও মনে করছেন অনেকে। কেননা, ভ্যান্স পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তিনি ইসরায়েলের প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল থাকবেন তা নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ইরান শান্তি প্রক্রিয়ার কারণে ইসরায়েলে ট্রাম্প ও ভ্যান্সবিরোধী মানুষের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে।
ইরান ইতোমধ্যে বুঝে গেছে যে তাদের যেকোনো দাবি আদায়ের জন্য হরমুজ বন্ধের হুমকিই হয়ত যথেষ্ট হবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের যেকোনো ‘স্বপ্ন’ ভেস্তে যেতে পারে তেহরানের ইসরায়েলবিরোধী শাসকদের চোখ রাঙানিতে।
বহুল আলোচিত ইরান শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প কি সেই পথই প্রশস্ত করলেন?






