নোয়াখালীতে ডায়রিয়ার প্রকোপ, ১২ দিনে ৪ জনের মৃত্যু

ওষুধ সংকট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে
আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

নোয়াখালীতে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। গত ১২ দিনে জেলায় ১ হাজারেরও বেশি মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৪ জন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু ও বয়স্ক।

গত ১৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসারত ৪ জন মারা গেছেন। এ ছাড়াও জেনারেল হাসপাতালের বর্হিবিভাগে চিকিৎসা সেবা নেওয়া ও ইনডোরে ভর্তি এবং ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আক্রান্ত ভর্তি ও চিকিৎসা সেবা নিয়েছে এমন রোগীর সংখ্যা ১ হাজারেরও বেশি।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ইনচার্জ নাসিমা আক্তার জানান,

হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ জন রোগী আসছে। তাদের মধ্যে গত ১২ দিনে ৪ জন মারা গেছেন। তারা হলেন- বেগমগঞ্জ উপজেলা হাজীপুর গ্রামের নজির আহম্মেদের মেয়ে ফারজানা আক্তার, উত্তর জিরতলী গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মো. হাছান, সুবর্ণ চর উপজেলার চর হাসান গ্রামের সামিরা জাহারা ও থানার হাট এলাকার আবু ইউছুফের ছেলে আকিব।

নোয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তীব্র গরমে গত ৭ দিন ধরে ডায়রিয়া সংক্রমণ ও রোগীর চাপ বেড়েছে। নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি থাকছেন ৪০-৫০ জন।

noakhali_diarrhoea_pic_01.jpg
নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বেডে জায়গা না থাকায় মেঝেতেও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। ছবি: স্টার

জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে উপকূলীয় হাতিয়া, সুবর্ণ চর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, স্থান সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের মেঝেতেও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ওষুধ সংকটের অভিযোগও করেছেন তারা।

হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজন রোগীর স্বজনেরা জানান, হাতপাতাল থেকে তাদের কোনো ওষুধ দিচ্ছে না। এক মাস বয়সী আশরাফুলের মা কুলছুম আক্তার বলেন, ভর্তির পর প্রতিদিনই নার্স তাদের হাতে স্লিপ ধরিয়ে দেন। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। মাঝে মধ্যে ডাক্তার এলেও রোগীর ফাইল দেখে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একই বিড়ম্বনার কথা জানান, ৮ মাস বয়সী আবিরের স্বজন মেরী আক্তার, ১৪ মাসের সাজ্জাদুরের মা রাবেয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগী সামছুদ্দিন (৩৫)।

তাদের প্রশ্ন সরকার হাসপাতালে ওষুধ দেয় তাহলে আমাদের কেন বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হবে, এতো ওষুধ যায় কোথায়!

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ইনচার্জ নাসিমা আক্তার জানান, শয্যা সংখ্যা ২০টি হলেও প্রতিনিয়ত রোগী ভর্তি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ জন। বাধ্য হয়ে শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। ডায়রিয়া রোগীর চিকিৎসা সেবায় ব্যবহৃত সিপ্রো আইভি, মেট্রোনিডাজল (আইভি), ইমিস্টেট ইনজেকশন, ক্যানুলা আইভি সরবরাহ কম থাকায় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতালের উপপরিচালক হাসিনা জাহান বলেন, হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে প্রতিদিন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা সেবা নিতে ভিড় জমাচ্ছেন। এখানে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ২০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ জন রোগী ভর্তি থাকে। গত ১ সপ্তাহ ধরে ডায়রিয়া রোগীর চাপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এই মুহূর্তে হাসপাতালে মেট্রোনিডাজল ও সিপ্রো আইভি (সিপ্রোফ্লক্সাসিন) ইজেকশান ছাড়া কোন ওষুধের সংকট নেই। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ওষুধের সংকট কেটে যাবে।

নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার জানান, ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত হাসপাতাল নেওয়া ও আইভি স্যালাইন দেওয়া প্রয়োজন। সঠিক সময়ে রোগীকে হাসপাতালে এনে চিকিৎসা সেবা দিলে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। চর ও গ্রাম অঞ্চলের লোকজন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে না এসে স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে অপচিকিৎসা ও অকালে মারা যান।

তিনি আরও বলেন নোয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জ চরাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্য সচেতনার অভাবে এবং তীব্র গরমে মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।

ওইসব অঞ্চেলের মানুষ নদী খাল ও পুকুরের পানি পান এবং গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহার করায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। তবে নোয়াখালীতে ডায়রিয়া পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে জেলার ৯টি উপজেলায় ২৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।

তবে ওষুধের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন তিনি।