নোয়াখালী

সয়াবিন খেতে পোকার আক্রমণ, কৃষি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ

আনোয়ারুল হায়দার

'শস্যভান্ডার' হিসেবে পরিচিত নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় সয়াবিন খেতে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এর ফলে চলতি মৌসুমে সয়াবিন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

পোকার আক্রমণ থেকে সয়াবিন রক্ষা করতে কিটনাশক প্রয়োগ করেও ফল পাচ্ছেন না কৃষকরা। এই দুঃসময়ে স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের লোকজন তাদের কোনো সহযোগিতা করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সুবর্ণচর উপজেলার বিভিন্ন সয়াবিন খেত ঘুরে ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়নে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করা হয়েছে। এর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন।

গত ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে সয়াবিন চাষ শুরু করে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে সয়াবিনের ফলন কাটা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

উপজেলার চর আমান উল্যা ইউনিয়নের ১০টি সয়াবিন খেত সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সয়াবিনের গাছে গাছে বিচা পোকা (পাতা খেকো) পোকার আক্রমণ দেখা গিয়েছে।

কয়েকজন কৃষক জানান, গত ১০-১৫ দিন ধরে সয়াবিন গাছের পাতার নিচের দিক থেকে পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। এসব পোকা গাছের সবুজ পাতা ও ডগার রস চুষে নেয়। এর ফলে পাতা ছিদ্র হয়ে ও মরে গিয়ে বাদামি রং ধারণ করে। কোথাও কোথাও গাছের পাতায় কালো দাগ ও ছিদ্র দেখা দিয়েছে। এ কারণে সয়াবিনে ফুল ফুটছে না, সয়াবিনের ফলনও হচ্ছে না।

চর আমানউল্যা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নরেশ মহাজন (৭৮) বলেন,  'আমি এ বছর এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ৫ একর জমিতে সয়াবিনের চাষ করেছি। এতে খরচ পড়েছে ১ লাখ টাকার কিছু বেশি। প্রতি একরে ৪০ মণ হিসেবে মোট ২০০ মণ ফলনের আশা ছিল। কিন্তু এখন পুরো জমিতেই পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে।'

এ বছর বিপুল পরিমান লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। অভিযোগ করে তিনি বলেন, 'কৃষি অধিদপ্তরের লোকজন এসে আমাদের মাঠ পরিদর্শন করেননি। কী ধরনের কিটনাশক ছিটালে এ পোকার থেকে ফসল রক্ষা করা যাবে সে পরামর্শও তারা দিচ্ছেন না।'

একই অভিযোগ করেছেন, কৃষক নিপু চন্দ্র দাস, শংকর চন্দ্র দাস, বিপুল চন্দ্র দাস, জগদিশ চন্দ্র দাস ও বর্গাচাষী কিরণ চন্দ্র দাস।

02.04.2022
ছবি: আনোয়ারুল হায়দার/স্টার

কিরণ চন্দ্র দাস (৫২) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'গত বছর আমি ১৬০ শতক জমিতে ২০ হাজার টাকা খরচ করে সয়াবিনের চাষ করেছিলাম। এতে ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। এ বছর আর্থিক সংকটের কারণে মাত্র ২০ শতক জমিতে সয়াবিন চাষ করতে পেরেছি। আমার পুরো খেতেই পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এর ফলে এ বছর লাভ করা তো দূরের কথা, পুঁজি ও উঠবে না। বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিলেও কৃষি বিভাগের লোকজন মাঠে আসেন না।'

কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, পোকার আক্রমণের কারণে এ বছর সয়াবিন উৎপাদনে ধ্বস নামবে। এর ফলে অনেক কৃষক পথে বসার উপক্রম হবে। অনেক কৃষক বিভিন্ন এনজিও ও মহাজন থেকে ঋণ নিয়ে এবং বাড়ির গরু-ছাগল বিক্রি করে লাভের আশায় সয়াবিন চাষ করেছিলেন।

জানতে চাইলে সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হারুনুর রশিদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'আমি এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা (সাবেক ব্লক সুপার ভাইজার) নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে থাকি। পোকার আক্রমণের বিষয়টি আমি জানতাম না। আমাকে কেউ এটি জানাননি।'

তবে বিচা পোকা বা পাতা খেকো পোকার সৃষ্টি ও আক্রমণের পেছনে বৈরি আবহাওয়াকে দায়ী করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, 'দিনে গরম ও রাতে কুয়াশার কারণেই বিচা পোকা সৃষ্টি ও সয়াবিন খেতে আক্রমণ হতে পারে। তবে গুণগত মানসম্পন্ন কিটনাশক সঠিক নিয়মে প্রয়োগ করলে সহজেই বিচা পোকার আক্রমন থেকে ফসল রক্ষা করা যায়। কীটনাশক প্রয়োগে অনেক কৃষক সঠিক নিয়ম না মেনে এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ ছাড়া বাজার থেকে নিম্ন মানের ওষুধ কিনে বেশি পরিমাণ পানিতে অল্প পরিমাণ কিটনাশক মিশিয়ে ছিটিয়ে দেন। এ কারণে পোকা মরেনা। পোকার আক্রমণ দেখা দিলে গুনগত মানসম্পন্ন কিটনাশক কিনে ২০০ মিলিলিটার কিটনাশক ৯-১০ লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে এমনভাবে স্প্রে করতে হবে যাতে করে গাছের আক্রান্ত পাতার নিচের ও উপরের অংশ ভিজে যায়। তাহলেই দ্রুত পোকা মারা যাবে।'

তিনি জানান, সুবর্ণচর উপজেলায় চলতি বছর ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিনের চাষ হয়েছে। প্রতি একরে ৩ মেট্রিক টন হিসেবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন।