চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার: র‍্যাবের দাবির সঙ্গে মিলছে না ঘটনা

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল নেতা ইলিয়াস খানকে অস্ত্র মামলায় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৭ ফাঁসিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইলিয়াসের পরিবারের সদস্যরা।

আকবর শাহ থানায় র‍্যাব-৭-এর করা মামলায় ৩৩ বছর বয়সী ওই যুবক এখন কারাগারে।

র‍্যাবের দাবি, গত ২৬ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে সিডিএ রোড-১ থেকে ইলিয়াসকে একটি ডাবল ব্যারেল পিস্তল ও দুটি কার্তুজসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তবে সাক্ষীদের বক্তব্য মামলার বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।

বন্দর নগরীর আকবর শাহ বিশ্ব কলোনী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ইলিয়াস চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন বলে ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়। পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৫ সালে 'বিএনপির দেশব্যাপী সহিংসতার' সময় নাশকতামূলক কার্যকলাপ চালানোর জন্য আকবর শাহ থানায় তার বিরুদ্ধে ১২টি মামলা হয়েছে।

অবাক করার বিষয় হলো, যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে সেটি আকবর শাহ থানা থেকে প্রায় ৪৫০ মিটার দূরে। ইলিয়াস থানার সামনেই 'ই অ্যান্ড আই ট্রেডার্স' নামে তার সিমেন্ট-বালি-লোহার দোকানে বসতেন।

র‍্যাব-৭ এর উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ চন্দ্র দেবনাথ গত ২৭ নভেম্বর ইলিয়াসের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। তবে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, র‍্যাবের এক তথ্যদাতা এসআইয়ের সঙ্গে যোগসাজশে ইলিয়াসকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২৬ নভেম্বর রাতে এসআই বিশ্বজিতের নেতৃত্বে র‍্যাব-৭ এর একটি দল আকবর শাহ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। একপর্যায়ে এসআই খবর পান একদল মাদক ব্যবসায়ী সিডিএ রোড-১-এ 'পপুলার ক্রোকারিজ' দোকানের সামনে জড়ো হয়েছেন।

রাত ৯টা ২৫ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে এক ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে। পরে র‍্যাব তাকে আটক করে। ইলিয়াসের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে র‍্যাব পরে সাক্ষীদের সামনেই আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ উদ্ধার করে। এরপর এসআই ঘটনাস্থলে একটি জব্দ তালিকা তৈরি করেন এবং তাতে সাক্ষীদের দিয়ে স্বাক্ষর করান।

এসআই স্থানীয় দুই ব্যক্তি ও র‍্যাব সদস্য এ বি এম সিদ্দিকুর রহমানকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেন।

এই প্রতিবেদক গত ৫ ডিসেম্বর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছেন। স্থানীয়রা জানান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় সাদা পোশাকের লোকজন দোকান থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে ইলিয়াসকে তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে সিডিএ রোড-১ এ নেওয়া হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয়।

চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বেঞ্চ সহকারী পেয়ার হাসান পলক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '২৬ নভেম্বর রাতে আমরা ইলিয়াসের দোকান থেকে কয়েক গজ দূরে আয়েশা ডেনিমের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ সাদা পোশাকের একদল লোক সেখানে এসে ইলিয়াসকে খুঁজতে থাকে।

পলক বলেন, 'ইলিয়াস তার পরিচয় নিশ্চিত করলে, তারা তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান। আমরা ইলিয়াসের পরিবারকে ঘটনাটি জানাই। প্রায় আধঘণ্টা পর, আমরা শুনতে পাই, র‍্যাব তাকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে।'

আয়েশা ডেনিমের সামনে পলক ও ইলিয়াসের সঙ্গে থাকা রেন্ট এ কার চালক মো আরিফ ও পলকের মত একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।

আয়েশা ডেনিমের স্বত্বাধিকারী মাহবুবুল ইসলাম বাবু দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ওই রাতে ইলিয়াস ও তার বন্ধুরা তার (বাবুর) দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিন জন সাদা পোশাকের লোক ইলিয়াসকে ধরে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পরে আমরা জানতে পারি ইলিয়াসকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'

ইলিয়াসের স্ত্রী হাজেরা হাসান মায়া যিনি একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা (পরিবারের সদস্যরা) একটি ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলাম যে ডিবির লোকজন আমার স্বামীকে তুলে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে আমরা শুনি সিডিএ এলাকা থেকে র‍্যাব একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা সেখানে ছুটে যাই।'

'আমরা সেখানে একটি মাইক্রোবাস এবং র‍্যাবের একটি পিকআপ দেখতে পাই। র‍্যাব সদস্যদের আমার স্বামী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেননি,' বলেন তিনি।

সাক্ষীদের ভাষ্য

মামলার জবানবন্দিতে র‍্যাবের প্রথম সাক্ষী আলী আকবর পপুলার ক্রোকারিজের বিপরীতে মসজিদের সামনে একটি অস্থায়ী দোকান চালান।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমি ওই রাতে আরও কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে গল্প করছিলাম। হঠাৎ একটি কালো মাইক্রোবাস ওই এলাকায় এসে পৌঁছায়।'

'আমি মাইক্রোবাসের কাছে র‍্যাবের একটি পিকআপও দেখেছি। কয়েকজন র‍্যাব সদস্য আমাকে মাস্ক ও শীতের পোশাকের দাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তারা আমার কাছ থেকে কিছু মাস্কও কিনেছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে একজন র‍্যাব কর্মকর্তা আমার কাছে এসে আমার নাম জিজ্ঞাসা করেন এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে বিস্তারিত জানতে যান।'

আকবর জানান, যখন তিনি র‍্যাব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন কেন তার এই তথ্যগুলো দরকার, তখন ওই কর্মকর্তা উত্তর দেন যে তারা একজনকে গ্রেপ্তার করছেন।

'আমি মাইক্রোবাসের ভেতরে একজন হাতকড়া পরা লোককে (ইলিয়াস) দেখি। মাইক্রোবাসের সামনের সিটে একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলাবারুদ ছিল,' তিনি যোগ করেন।

২৬ নভেম্বরের ঘটনার কথা স্মরণ করে র‍্যাবের দ্বিতীয় সাক্ষী মো. রিয়াজ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি তার দোকানে (পপুলার ক্রোকারিজ) গ্রাহকদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

আমি বাইরের রাস্তায় র‍্যাবের একটি পিকআপ দেখেছি। হঠাৎ, একজন র‍্যাব সদস্য আমাদের দোকানে এসে আমাকে আমার ব্যক্তিগত বিস্তারিত তথ্য দিতে বলেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিয়াজ বলেন, 'আমি যখন জানতে চাইলাম কেন তাদের তথ্যের প্রয়োজন, তখন তারা আমাকে অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলে। পরে তারা আমাকে মাইক্রোবাসের পিছনের সিটে বসা লোকটিকে (ইলিয়াস) দেখান। আমি গাড়ির সিটে একটি আগ্নেয়াস্ত্রও দেখেছি।'

এসআই সাক্ষীদের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছেন বলে দাবি করেছেন। তবে দুই সাক্ষীর তথ্য অনুযায়ী সেই দাবি সম্পূর্ণ বিপরীত।

র‍্যাব যা বলছে

র‍্যাব-৭ এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম ইউসুফ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তারকৃতের পরিবার অনেক কিছু দাবি করেন। র‍্যাব তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে। কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর সুযোগ নেই।'

'মাঝে মাঝে সাক্ষীরা ভয় পেয়ে যায়। তবে নিশ্চিত থাকুন আমরা কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাবো না,' যোগ করেন তিনি।

ইলিয়াসের পরিবারের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই বিশ্বজিৎ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অনুবাদ করেছেন সুমন আলী