তালেবান-চীন সখ্যতা: আফগানিস্তানে আশ্রয় নেওয়া উইঘুরদের নতুন উদ্বেগ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

প্রায় ৪৫ বছর আগে নির্যাতনের ভয়ে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পালিয়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলেন উইঘুর জাতিগোষ্ঠীর তুহান। এখন সেই আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে আসায় তিনি আতঙ্কিত।

আজ এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানায়, তালেবানের সঙ্গে চীনের সখ্যতার কারণে চীনের অনুরোধে আফগানিস্তান থেকে উইঘুরদের বিতাড়িত করা হতে পারে এমন ভয় করছেন সেখানে আশ্রয় নেওয়া উইঘুররা।

তুহান (ছদ্মনাম) এখন পড়েছেন উভয় সংকটে। একদিকে তার মাতৃভূমিতে উইঘুরদের ওপর নির্যাতন চলছে; অন্যদিকে, তিনি যে দেশে আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে তাকে বহিরাগত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আফগানিস্তানে উইঘুরদের ভয়ের কারণ

গত কয়েক বছর ধরে চীন নিরাপত্তার কথা বলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু উইঘুরদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের ওপর 'গণহত্যা' চালানোর অভিযোগ করছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চীন অন্তত ২০ লাখ উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলমানকে বন্দী শিবিরে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের দাবি সেখানকার 'কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো'র মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে তুহান তার পরিবারকে নিয়ে শঙ্কায় আছেন। তার ভয়— যদি তাদেরকে আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করা হতে পারে।

'এখানে (আফগানিস্তানে) আমরা বেশ কষ্টে আছি। কিন্তু, এখন (তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর) যা ঘটছে তা আরও ভয়ঙ্কর। আমরা যে উইঘুর তা চিহ্নিত করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা বিপদে আছি।'

তুহান যখন পরিবারের সঙ্গে জিনজিয়াংরে ইয়ারকন্দ থেকে পালিয়ে আফগানিস্তানে এসেছিলেন তখন তার বয়স ছিল সাত বছর। সেসময় অন্যান্য শহরের মতো কাবুলকেও বলা হতো 'প্রাচ্যের প্যারিস'।

চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মাম্বলীদের ওপর নির্যাতন শুরু হলে উইঘুরদের জন্যে কাবুল হয়ে ওঠে 'আশ্রয়স্থল'।

'দ্য ওয়ার অন দ্য উইঘুর' বইয়ের লেখক ও জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সান রবার্টসের মতে, তুহানের মতো প্রায় তিন হাজার উইঘুর আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন।

১৯৪৯ সালে চীন জিনজিয়াং দখল করে নিলে অনেকে সেখান থেকে পালিয়ে যান। তুহান এসেছিলেন সত্তরের দশকের মাঝামাঝি।

অনেক উইঘুর আফগানিস্তানের নাগরিকত্ব পেলেও তাদের পরিচয়পত্রে 'চীনা শরণার্থী' লেখা আছে। আফগানিস্তানে জন্ম হওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের উইঘুরদের পরিচয়পত্রেও এই শব্দ দুটি লেখা আছে।

জিনজিয়াং থেকে আব্দুল আজিজ নাসেরির পরিবার আফগানিস্তানে এসেছিলেন ১৯৭৬ সালে। কাবুলে তার জন্ম হলেও তার পরিচয়পত্রে 'চীনা শরণার্থী' লেখা আছে।

তুরস্কে চলে আসা নাসেরি বলেন, 'আফগানিস্তানের উইঘুররা চীনের ভয়ে আছে। কারণ, তালেবান 'পেছনের দরজা দিয়ে" চীনের সঙ্গে সমঝোতা করছে। উইঘুররা তাদেরকে চীনে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে ভীত।'

চীন 'ভালো বন্ধু'

গত জুলাইয়ে তালেবানের শীর্ষ নেতাদের একটি দল চীন সফরে গিয়েছিল। তারা তিয়ানজিন শহরে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই'র সঙ্গে দেখা করেন।

সেসময় ওয়াং বলছিলেন, 'তালেবান আফগানিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি'। চীন তখন আফগানিস্তানে শান্তি, সৌহার্দ্য ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার ঘোষণা দেয়।

এর বিপরীতে তালেবান চীনকে 'ভালো বন্ধু' হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল।

গত সপ্তাহে 'চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক' রক্ষার আহ্বান জানিয়ে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিজিটিএনকে বলেন, 'চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী। অতীতে দেশটির সঙ্গে ইতিবাচক ও ভালো সম্পর্ক ছিল।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা সেই সম্পর্ককে আরও জোরালো করতে চাই। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে চাই।'

অধ্যাপক সান রবার্টস বলেন, উইঘুরদের ভয় হচ্ছে তালেবান বেইজিং থেকে আরও সহযোগিতার আশায় উইঘুরদের আফগানিস্তান থেকে বের করে দিতে পারে।

গত জুনে প্রকাশিত উইঘুর হিউম্যান রাইটস প্রজেক্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৭ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশ অন্তত ৩৯৫ উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বার্তায় সিএনএনের কাছে এই মানবাধিকার সংগঠনটিকে 'চীনবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী' হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, 'এমন তথ্যের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।'

এদিকে, তুহান গণমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, তার ও পরিবারের কারো পাসপোর্ট নেই। তাই তারা আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে পারছেন না। 'প্রায় ৪৫ বছর হলো এখানে পালিয়ে এসেছি। বৃদ্ধ হয়ে গেলাম। কিন্তু, এ জীবনে সুন্দর একটা দিন পেলাম না।'