ইসরায়েল যেভাবে মূল্যায়ন করে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. কাদির খানকে
ড. আবদুল কাদির খান বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের 'পরমাণু বোমার জনক' হিসেবে পরিচিত হলেও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কাছে তার পরিচয় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির 'গডফাদার' হিসেবে।
ইসরায়েলের 'চরম শত্রু' ইরানকে পরমাণু প্রযুক্তি দিয়েও কীভাবে মোসাদের 'হাত থেকে' বেঁচে গেলেন ড. খান তা নিয়ে গত ১১ অক্টোবর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ একটি বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করছে।
বিশদ আলোচনায় ইয়োশি মেলমান তুলে ধরেছেন ড. কাদির খানের 'বেসরকারি পরমাণু বাণিজ্যের' দীর্ঘ ইতিহাস।
মেলমান লিখেছেন, ড. আবদুল কাদির খান হচ্ছেন খুব কম সংখ্যক পরমাণু বিজ্ঞানীদের একজন যিনি ইসরায়েলের প্রধান শত্রু ইরানের সঙ্গে কাজ করেও স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন।
তিনি আরও লিখেছেন, ড. কাদির খানের কাছ থেকে পাকিস্তানের পি-ওয়ান ও পি-টু সেন্ট্রিফিউজের নকশা ও পরিকল্পনা কিনে ইরান তার শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মোহসেন ফাখরিজাদেহ'র নেতৃত্বে নিজেদের মতো করে সেন্ট্রিফিউজ বানিয়ে নেয়। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ড. মোহসেন মোসাদের হামলায় প্রাণ হারান।
'মোসাদের তৎকালীন প্রধান শাবতাই শাভিত মধ্যপ্রাচ্যে ড. কাদির খানের গভীর বিচরণ বিবেচনায় নিয়েছিলেন' উল্লেখ করে লেখক বলেন, 'কিন্তু, প্রায় দেড় দশক আগে শাভিত আমাকে বলেছিলেন যে মোসাদ ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আমান ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি ড. খান আসলে কী করতে যাচ্ছেন।'
পরবর্তীতে দেখা গেছে, ড. কাদির খানের দেওয়া সেই সেন্ট্রিফিউজ উন্নত করে ইরান আইআর-থ্রি-ফোর-ফাইভ-সিক্স-সেভেন নাম দিয়েছে। সেগুলো নাতাঞ্জ ও ফোরদো পরমাণুকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের জন্যে উদ্বেগের।
ড. কাদির খানকে পরমাণু বোমার 'অপ্রচলিত ব্যবসা' শুরুর কারিগর হিসেবে উল্লেখ করে হারেৎজ'র মতামতে বলা হয়েছে— ১৯৩৬ সালে ভারতের ভূপালে জন্ম নেওয়া আবদুল কাদির খান দেশভাগের কারণে তার পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে আসেন ১৯৫২ সালে।
১৯৭২ সালে ৩৬ বছর বয়সী ড. কাদির খানকে নেদারল্যান্ডের এক গবেষণাগারে পাঠানো হয়। ইউরোপিয়ান ইউআরইএনসিও কনসর্টিয়ামের মাধ্যমে পরিচালিত সেই গবেষণাগারে সেন্ট্রিফিউজ বানানো হয়।
১৯৭৫ সালে কাদির খান সেখান থেকে নথিপত্র 'চুরি' করে পাকিস্তানে চলে আসেন। ডাচ গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনাটি উদঘাটন করেছিল। এরপর, কাদির খান প্রতিবেশী ভারতের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে পাল্লা দিতে পাকিস্তানে পরমাণু কর্মসূচি গ্রহণের জন্যে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে অনুরোধ করেন।
কাকতালীয়ভাবে সে বছরেই ইসরায়েলের তৎকালীন গোয়েন্দা আরনন মিলশান একই রকমের নথি 'চুরি'র সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ও ইসরায়েলের সায়েন্টিফিক লিয়াজোঁ ব্যুরোর গোয়েন্দা ইউনিট এক জার্মান প্রকৌশলীর কাছ থেকে ইউআরইএনসিও'র সেন্ট্রিফিউজের নকশা 'কিনে' নেন। পরবর্তীতে ইসরায়েলের দিমোনায় পরমাণু বোমার জন্যে সেরকম সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করা হয়।
১৯৯৮ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালালেও ধারণা করা হয় এর কয়েক বছর আগেই দেশটি সেই সক্ষমতা অর্জন করে।
মেলমান লিখেছেন, প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে পরমাণু বোমায় বলিয়ান করার পর ড. কাদির খান অবসর নেন এবং পরমাণু বোমার 'অপ্রচলিত ব্যবসা' শুরু করেন। তিনি দুবাইয়ে প্রতিষ্ঠান খুলে নিজের পরমাণুজ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রকৌশলী, ঠিকাদার, অর্থদাতা ও সহযোগীদের নিয়ে গোপনে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
একজন পরমাণু প্রতিভা ও মুসলমানদের হাতে প্রথম পরমাণু বোমা এনে দেওয়া ড. কাদির খান ১৯৮০ দশকের শেষ ও ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে অসংখ্যবার মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন।
সেসময় সৌদি আরব, মিশর, আলজেরিয়া ও সিরিয়া ড. কাদির খানের অর্থের বিনিময়ে পরমাণু বোমা বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও ইরান ও লিবিয়া তা গ্রহণ করে।
লিবিয়ার বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো ও বিশেষজ্ঞ না থাকায় দেশটির তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি পরমাণু বোমা বানানোর পুরো দায়ভার ড. কাদির খানের ওপর দিতে চান।
এ দিকে, বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে রেজা শাহের আমল থেকেই পরমাণু কর্মসূচি চলতে থাকায় এবং ইউরোপ-আমেরিকায় পড়ালেখা করা নিজেদের পরমাণু বিজ্ঞানী থাকায় তেলসমৃদ্ধ ইরান নিজেদের মতো করে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র 'মানববিধ্বংসী অস্ত্র' রাখার অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করলে গাদ্দাফি বুঝতে পারেন যে এরপর তার দেশে হামলা হতে পারে। সেসময় তিনি সিআইএ ও এমআইসিক্স'র সঙ্গে দেনদরবার শুরু করেন। সেসময় ড. কাদির খানের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জানতে পারে বলে হারেৎজ'র মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইএ ও এমআইসিক্স বিষয়টি গোপন রেখে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ'র মাধ্যমে একে প্রাতিষ্ঠানিকরণ করে নেয়।
২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বিবিসির সংবাদের মাধ্যমে মোসাদ ও আমান ঘটনাটি জেনে বিস্মিত হয় বলে লিখেছেন ইয়োশি মেলমান।
কিন্তু, শীর্ষ পেশাদার গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে লিবিয়ার 'গোপন পরমাণু ও রাসায়নিক অস্ত্রের কর্মসূচি' গণমাধ্যমসূত্রে কেন জানতে হয়েছে তা মেলমান তার লেখায় উল্লেখ করেননি।
তবে ইসরায়েল জানতে পারে সিরিয়া তার দুর্গম মরুভূমিতে পরমাণু রিঅ্যাকটর তৈরি করছে। সেই কাজে ড. কাদির খান ও ইরানের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না উল্লেখ করে লেখক আরও বলেন, মূলত উত্তর কোরিয়ার সহযোগিতায় সিরিয়া প্লুটোনাম উৎপাদনের চেষ্টা করছিল। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী সেই রিঅ্যকটরটি ধ্বংস করে দেয়।
মেলমানের মতে, আইএইএ'র মাধ্যমে লিবিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য আলোচনা থেকেই জানা যায় ড. কাদির খান ইরানের কাছে পরমাণু সংক্রান্ত নথি বিক্রি করেছেন। এরপর ২০০৬ সালে রাশিয়া ও চীনের সম্মতিতে নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
সেই নিষেধাজ্ঞার পর ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি গোপনে চালিয়ে যেতে থাকে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ আলোচনা ও দেনদরবার শেষে ২০১৫ সালে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান বিশ্বশক্তির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত রাখতে রাজি হয়।
কিন্তু, ২০১৮ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ'র প্রধান ইয়োশি কোহেনের প্ররোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসায় ইরান আবার পূর্ণ গতিতে পরমাণু কর্মসূচি শুরু করে।
ইসরায়েল মনে করে, ইরান এখন পরমাণু বোমা অর্জনকারী দেশ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। আর এর ভিত্তিমূল তৈরি করে দিয়েছেন ড. কাদির খান।
ড. কাদির খান শুধু যে মোসাদের 'হাত থেকে' বেঁচে গেছেন তাই নয়। সিআইএও তাকে থামাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন ইয়োশি মেলমান। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ড. কাদির খানের ভূমিকা ও পরবর্তীতে তার 'ফ্রিল্যান্স পরমাণু বাণিজ্য' থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল সিআইএর হাতে।
১৯৭৫ সালে ড. কাদির খান নেদারল্যান্ড থেকে চলে আসার পর তৎকালীন ডাচ প্রধানমন্ত্রী রুড লুবারস জানতে পারেন যে সবকিছুই ঘটেছে সিআইএর চোখের সামনে। আর পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর দেশ হতে বাধা দিতে চায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
সিআইএ সবসময়ই ড. কাদির খানকে 'চোখে চোখে' রেখেছে উল্লেখ করে লেখক মেলমান বলেন, দুবাইয়ে ড. খানের ব্যবসায় সিআইএ ঢুকে পড়েছিল। তার সুইস সহযোগী সিআইএ'র হয়ে কাজ করতেন। পরে ড. কাদির খানের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৩ সুইস বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুইজারল্যান্ড, দুবাই ও মালয়েশিয়ায় উৎপাদিত সেন্ট্রিফিউজের যন্ত্রাংশ বিক্রি করেছিলেন। ২০১২ সালে সুইজারল্যান্ড সরকার তাদেরকে কারাদণ্ড দিলেও তাদের কারাভোগ করতে হয়নি। কেননা, সিআইএ তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছিল যে প্রকৌশলীরা গোয়েন্দাদের সহযোগিতা করছেন।
২০০৪ সালে লিবিয়ার ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তান ড. কাদির খানের সঙ্গে 'কথা' বলে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয় না। এমনকি, আইএইএ ড. খানকে জেরা করতে চাইলে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। তাই ড. কাদির খানের অনেক কথাই অজানা রয়ে যায়।
পরে, পাকিস্তানের জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে ড. কাদির খান তার 'গোপন পরমাণু ব্যবসা'র কথা স্বীকার করলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে ঘোষণা দেন। এরপর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ তাকে গৃহবন্দী করেন।
পাকিস্তানিদের চোখে ড. কাদির খান 'জাতীয় বীর'। দেশটির ইতিহাসে তার নাম উচ্চারিত হবে গৌরবের সঙ্গে। তিনি সামরিক শক্তির দিক থেকে পাকিস্তানকে তুলে এনেছেন নতুন উচ্চতায়। কিন্তু, মেলমানের লেখায় ড. কাদির খানের যে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো এই 'পরমাণু প্রতিভা' বিস্ময়কর সফলতায় গড়ে তুলেছিলেন 'গোপন ব্যক্তিগত পরমাণু বাণিজ্য'। শুধু তাই হয়, এমন চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরও তিনি গুপ্তহত্যা থেকে বেঁচে গেছেন।
ড. কাদির খান এমন একজন পরমাণু বিজ্ঞানী যিনি সব সময়ই ইসরায়েলের শত্রুদের সহযোগিতা করেছিলেন। কৌশলগত সামরিক সক্ষমতার বৈশ্বিক চিত্র বদলে দিয়েছিলেন। অথচ, মোসাদ তাকে হত্যা করেনি। কিন্তু, কেন?— এর উত্তর না দিয়ে লেখক যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন তা হলো: ড. কাদির খান ৮৫ বছর বয়সে স্বাভাবিকভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিছানায় শুয়েই!