হাওরে নেই বৈশাখী আনন্দ
'ধান করছিলাম ১০ কিয়ার। টিকছে না। এখন এইতাই কাইট্টা আনি, খাইতে পারলে খায়াম। কষ্ট ছাড়া তো চলতাছে না, বইয়া থাকলে তো চলতাছে না।'
আগাম বন্যায় ডুবে নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলতে তুললে আক্ষেপ করে বলছিলেন নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার জৈনপুর গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক সুরুজ মিয়া।
গত ৪ এপ্রিল রাতে চন্দ্রসোনারথাল হাওরে কংস নদীর পাড়ে ডুবাইল ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায় এ হাওরের কৃষকদের একমাত্র ফসল বোরো ধান।
এ হাওরেই পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে কৃষক সুরুজ মিয়ার ১০ কিয়ার (৩২ শতাংশে এক কিয়ার বা কেদার) জমির ধান। গত ৪ এপ্রিল রাতে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল হাওরে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায় সুরুজ মিয়ার মতো কয়েকশ কৃষকের কষ্ট।
কৃষকরা পানিতে তলিয়ে যাওয়া যে ধান কেটে তুলছেন, তার বেশিরভাগই নষ্ট। ধান থেকে চাল না হয়ে খুদ হবে। আর এর বেশিরভাগই মানুষের নয়, বরং গবাদীপশুর খাদ্য হিসেবেই সংগ্রহ করছেন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা।
উপজেলার রাজাপুর গ্রামের কৃষাণী রাবিয়া বিবি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমি চাইর হাল ধান করছিলাম। এক কিয়ারও তুলতে হারছি না। আমার ১৫-১৬ ডা গরুও মারা যাইবো খেড়ের অভাবে।'
বৈশাখ মাস হাওরাঞ্চলের নতুন ধানের উৎসবের মৌসুম। চৈত্রের শেষ থেকেই বোরো ধান তুলতে শুরু করেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। ধান মাড়াই, বাছাই, সিদ্ধ করা, বিক্রি করা—এক আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়ে দিন কাটান কৃষকরা।
কিন্তু এ বছর ভারতের মেঘালয়ে ব্যাপক বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে ১ এপ্রিল থেকেই সৃষ্টি হয় বন্যা পরিস্থিতি। আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো আবাদ তলিয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেব মতে, এসব জেলায় মোট ৭ হাজার ৮৩ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেক ধান নষ্ট হয়েছে।
তবে কৃষক ও হাওর অধিকার সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্লাবিত হয়েছে এর থেকেও অনেক বেশি জমি এবং অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। মোট ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১২৫ কোটি টাকার।
ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আমির হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '৪০ কিয়ার জমিতে ধান করেছিলাম। কিছুটা উপরে থাকা ৫ কিয়ার জমি ছাড়া আর সবই গেছে। যেটুকু উঠাতে পেরেছি তাও চাল হবে না, খুদ হয়ে যাবে। এগুলো এত খারাপ যে পাইকাররা কিনতে চায় না, ধান কাটা শ্রমিকরাও মজুরি হিসেবে নেয় না।'
তিনি বলেন, 'ঋণ করে ধান করেছিলাম। দেড়লক্ষ টাকা ঋণে আছি। কিস্তিওয়ালারা এখন বাড়িতে এসে বসে থাকে। খাওয়ার ধানই নাই, কিস্তি দিব কীভাবে। হাওরে তো আর কোন কাজ নাই।'
রাজাপুর গ্রামের আজির উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের এলাকাটা খুবই গরীব। আমাদের কাচা ধান বন্যায় তলিয়ে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। আর পনেরো দিন পরে যদি বাঁধ ভাঙতো তাইলে কিছুটা ধান ঘরে উঠতো। এখন তো একেবারে মরা।'
একদিকে ধান তলিয়ে যাওয়া এলাকার কৃষকদের হাহাকার, তার সাথে আবারও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্থ করছে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলায় এবং ভারতের মেঘালয় ও আসামে বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেবে।
একই সাথে ফসল রক্ষায় নির্মিত বাঁধ বন্যার প্রথম ধাক্কায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এবং সাধারণ কৃষকরা দিনরাত কাজ করে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হাওরাঞ্চলের কৃষকদের একটাই ফসল। বৈশাখী ধান। কিন্তু এবার বন্যার কারণে কৃষকদের মধ্যে নতুন ধানের বা বৈশাখী কোনো আনন্দ নেই। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের যে অবস্থা, এখন আবার পানি বাড়লে ক্ষতির আশঙ্কায় আছেন কৃষক।'