পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরের ৭ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান

দ্বোহা চৌধুরী
দ্বোহা চৌধুরী

পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় আবারো বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও সিলেটের হাওরাঞ্চলের কৃষক।

গত ১ এপ্রিল থেকে পাহাড়ি ঢলের প্রথম ধাক্কায় এই চার জেলায় এরইমধ্যে ডুবেছে ৭ হাজার ৮৩ হেক্টর বোরো খেত। যার মধ্যে কেবলমাত্র সুনামগঞ্জ জেলাতেই ৪ হাজার ৯০০ হেক্টর ফসলের খেত প্লাবিত হয়েছে।

মাসের শুরুতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে খুব বেশি বৃষ্টি না হলেও ভারতের মেঘালয়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে নদনদী উপচে হাওরের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি।

পাহাড়ি ঢলের প্রথম তোড়ে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার আনুষ্ঠানিক কোনো হিসেব দেয়নি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

তবে হেক্টর প্রতি বোরো ধানের গড় ফলন এবং গত বছরের সরকার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের হিসেবে ডুবে যাওয়া হাওরে ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার।

এদিকে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র চলতি সপ্তাহের শেষে হাওরাঞ্চলে আরেকটি আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে।

হাওরাঞ্চলের বেশিরভাগ জায়গায় পাহাড়ি ঢলের প্রথম তোড় সামলে নিতে পারলেও দ্বিতীয় ধাক্কায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের।

গত ১ এপ্রিলের পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ৬০ বছর বয়সী কৃষক আয়নাল মিয়া টাঙ্গুয়ার হাওরে হারিয়েছেন তার ২ একর জমির ধান।

'সবাই মিলে অনেক চেষ্টা করেও বাঁধটা টেকাতে পারিনি, এটা ছিল আমার সারা বছরের ফসল,' আক্ষেপ নিয়ে বলেনি তিনি।

আয়নাল হকের মতো হাওরাঞ্চলের এই চার জেলার কয়েক লাখ কৃষক এবার ৪ দশমিক ০৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বছরে এই একটিই ধান চাষের মৌসুম।

গত দুই বছর ধানের বাড়তি দামের কারণে কৃষকরা এবার বেশি জায়গায় ধান চাষ করেছেন। চলতি বছরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের বাম্পার ফলনেরও আশা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের।

পাহাড়ি ঢলের প্রথম ধাক্কা শেষে কয়েকদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদনদী ও হাওরের পানি হ্রাস পেতে থাকলে কৃষকরা আবারও আশান্বিত হয়েছিলেন এ যাত্রায় রক্ষা পাওয়ার।

কিন্তু পূর্বাভাস অনুযায়ী গত রাত থেকে খারাপ হতে শুরু করেছে আবহাওয়া। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর বেশকিছু এলাকায়।

এ অবস্থায় কৃষকদের বেশিরভাগই অবস্থান নিয়েছেন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে। পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভাঙা ঠেকাতে নিচ্ছেন প্রস্তুতি।

গতকাল শনিবার দেওয়া বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ভারতের মেঘালয় ও আসাম প্রদেশে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বৃষ্টিপাত বেশি হলে এই সপ্তাহের শেষে আরেকটি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। নদনদী ও হাওরে পানির উচ্চতা এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে মাঝারি বৃষ্টিপাতেও সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।'

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার শাইল্যানি গ্রামের কৃষক তারা মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঢলের প্রথম ধাক্কা বাঁধ জোড়াতালি দিয়ে ঠেকানো গেছে। কিন্তু আরেকটা ধাক্কা হয়তো সামলানো যাবে না। যদি তা হয়, তাহলে যা চাষ করেছি তার সবই ডুববে।'

হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষায় সরকারি বরাদ্দে 'কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) নীতিমালা ২০১৭' এর অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে হাওরে বাঁধ নির্মাণ করা হয় প্রতিবছর।

এ বছর সুনামগঞ্জে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ, নেত্রকোণায় ২৩ দশমিক ০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮৩ কিলোমিটার, কিশোরগঞ্জে ১৩ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬ কিলোমিটার এবং সিলেটে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ দশমিক ৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

পাহাড়ি ঢলের প্রথম তোড়ে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনার থাল হাওর এবং দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ভেঙে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি বাঁধ ভেঙেছে হাওরে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যমতে, পাহাড়ি ঢলের প্রথম ধাক্কা সামলে মাটি দিয়ে বানানো প্রায় সবকটি বাঁধ এখন ঝুঁকিতে।

পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুদ্দোহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এই মুহূর্তে আমরা টিকে থাকা সবকটি বাঁধ রক্ষায় কাজ করছি। বাঁধে ফাটল দেখা দিলে তা দ্রুত মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সবকটি উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে আমরা চেষ্টা করবো বাঁধ রক্ষার।'

২০১৭ সালের ব্যাপক বন্যায় হাওরাঞ্চলের প্রায় সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকাশ্যে এলে সরকার কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) নীতিমালা সংশোধন করে।

নীতিমালা অনুযায়ী ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে বাঁধ সংলগ্ন কৃষিভূমির কৃষকদের নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে বাঁধ নির্মাণের নির্দেশনা রয়েছে। নীতিমালায় ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে কমিটি গঠন করে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ শেষের নির্দেশনা রয়েছে।

হাওর ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'দেরিতে কাজ ‍শুরু করে শেষে তাড়াহুড়া করায় হাওরের প্রতিটি বাঁধ অত্যন্ত দুর্বল হয়েছে। বাঁধের কমপেকশন (মাটি শক্ত করে বসানোর প্রক্রিয়া) ঠিকভাবে শেষ না করেও বাঁধ নির্মাণ শতভাগ হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই অবস্থায় এসব বাঁধ বন্যার স্বাভাবিক ধাক্কাও সামলাতে না পেরে ফাটল দেখা দিচ্ছে এবং ভেঙে যাচ্ছে। তার উপর রয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও গাফিলতি। এদের আইনের আওতায় আনতে হবে।'

তিনি বলেন, 'স্বল্পমেয়াদে বাঁধ রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। পাউবোকে সর্বশক্তি দিয়ে এবং কৃষকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠিয়ে নিশ্চিত করে বাঁধ রক্ষা করতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সবকটি নদী খনন জরুরি। একইসঙ্গে মেঘনার মোহনায় ব্যাপক নদীখনন প্রয়োজন যাতে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।'

গতকাল বাঁধ পরিদর্শনে এসেছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী ও সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মান্নান। তিনি শান্তিগঞ্জের ও জগন্নাথপুর উপজেলার দুটি বাঁধ পরিদর্শন করেন এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।

বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, 'অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এই মুহূর্তে যাতে বাঁধ ভেঙে আর কোনো ক্ষতি না হতে পারে, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও বেশি মনযোগী হতে হবে।'