আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস

অর্ধেক শিশুই পড়তে ও অর্থ বুঝতে পারে না

৭-১৪ বছর বয়সীদের ওপর জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে; ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য সরকারের
আরাফাত রহমান
আরাফাত রহমান

সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই এখনো সহজ কোনো গল্প পড়তে বা পড়ে অর্থ বুঝতে পারে না।

চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সসীমার মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশ শিশু পড়ার প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করেছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এই উন্নতির হার খুবই সামান্য, মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট।

এমনকি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাত্র ৬২ শতাংশ এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে. অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় দুইজনই এখনো পিছিয়ে। ছয় বছর আগে এই হার ছিল ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই ফলাফল কাগজে-কলমে বাংলাদেশের সাক্ষরতার অগ্রগতি এবং শিশুদের প্রকৃত শিক্ষার মধ্যকার বড় ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, শিশুরা যদি পড়তে এবং বুঝতে না শেখে, তবে কেবল সাক্ষরতার হার বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সাক্ষরতার প্রকৃত ভিত এখনো তৈরি হয়নি।’

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি সাক্ষরতার পরিসংখ্যান মূলত মানুষ নিজে পড়তে ও লিখতে পারে কি না—এমন দাবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তবে পড়া, বোঝা এবং গাণিতিক দক্ষতার প্রকৃত মূল্যায়নে বাস্তব চিত্রটি প্রায়ই অনেক বেশি দুর্বল দেখা যায়।  

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, এরপর লক্ষ্য স্থির করতে হবে।’

‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হচ্ছে। আর এই সময়ে শিক্ষার এমন পরিস্থিতির চিত্র সামনে এলো।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ গতকাল সোমবার জানান, সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে সাত বছর ও তদুর্ধ্ব বয়সীদের সাক্ষরতার হার বর্তমানের ৭৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। এ ছাড়া ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর প্রাপ্তবয়স্ককে ফাংশনাল লিটারেসির কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

সাধারণত মানুষ নিজে পড়তে বা লিখতে পারে কি না—এমন স্ব-ঘোষিত তথ্যের ভিত্তিতে সাক্ষরতার হার নির্ধারিত হলেও এমআইসিএস জরিপে শিশুদের সরাসরি একটি ছোট অনুচ্ছেদ পড়তে এবং তা বুঝতে পারার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।

এই জরিপ অনুযায়ী, পড়ার প্রাথমিক মানদণ্ড পূরণে একজন শিশুকে একটি গল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে হয় এবং গল্প থেকে সরাসরি ও গভীর অনুধাবনমূলক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এমআইসিএস জরিপে ৬৪ জেলার ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৩১ হাজার ৮৫৯ শিশুর শিক্ষার মান যাচাই করা হয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু একটি গল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে। তবে সবকটি শর্ত পূরণ করে পড়ার প্রাথমিক মানদণ্ড অর্জন করতে পেরেছে মাত্র অর্ধেক শিশু।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিশুদের মধ্যে মাত্র ২৮ দশমিক ২ শতাংশ পড়ার প্রাথমিক দক্ষতা দেখাতে পেরেছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

শ্রেণি ধাপ পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সক্ষমতার হার কিছুটা বাড়লেও অনেক শিশুই মৌলিক দক্ষতা অর্জন না করে উচ্চতর শ্রেণিতে পৌঁছে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির মাত্র ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী নির্ধারিত মান অর্জন করতে পেরেছে; চতুর্থ শ্রেণিতে এই হার ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৬২ শতাংশ।

পঠন দক্ষতার বাইরেও দুর্বলতা

চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণির ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে এবং ৬৫ শতাংশ বাংলায় ‘প্রারম্ভিক’ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ, তারা তাদের শ্রেণির উপযোগী অন্তত অর্ধেক প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।

জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য উল্লেখ করে অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, বাংলা ও গণিতে নিজ শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন না করেই শিশুরা বারবার তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আসল সমস্যা কেবল শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে নয়, বরং তারা স্কুলে গিয়ে আসলে কী শিখছে তা নিয়ে।’

জাতীয় গড় হিসাবের আড়ালে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্রটিও ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে প্রতি তিনজনে মাত্র একজনের পড়ার প্রাথমিক দক্ষতা রয়েছে। এর বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ভৌগোলিক বিচারেও বৈষম্য স্পষ্ট; গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৪৮ শতাংশ হলেও শহরের শিশুদের ক্ষেত্রে তা ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বাংলাদেশকে এখন একই সঙ্গে দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে: প্রথমত, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নয়ন করা এবং দ্বিতীয়ত, যারা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা।

তিনি উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসারের ফলেই মূলত স্বাক্ষরতার হারে অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে, যা শিশুদের স্বাক্ষরতার একটি প্রাথমিক স্তর অর্জনে সহায়তা করেছে। তবে যারা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়েছে বা যারা প্রাপ্তবয়স্ক, তাদের জন্য আলাদাভাবে ‘জীবনব্যাপী শিক্ষা’র সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন, বাংলাদেশের সাক্ষরতা উদ্যোগগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির বদলে বিভিন্ন প্রকল্প-নির্ভর রয়ে গেছে।

তিনি মনে করেন, এই ধরনের খণ্ডিত পদ্ধতির কারণে বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় এবং সাক্ষরতার প্রচেষ্টায় স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আসে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও বাস্তবতাকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

তার মতে, সাক্ষরতা কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষতামুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

কর্মসূচির সফলতার জন্য তিনি তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘সদিচ্ছা, সক্ষমতা ও সমন্বয়—এই তিনটিরই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে; সাক্ষরতা অভিযানে সফল হতে হলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

বর্তমানে সরকারিভাবে ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫৮টি জেলা সদরে স্কুল থেকে ঝরে পড়া বা স্কুলে না যাওয়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের সাক্ষরতা এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা।